ফরিদপুরে ধুমধাম করে বিয়ের পর কনেপক্ষের অস্বীকার, ধর্ষণ মামলায় কারাগারে বর
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
ফরিদপুরের নগরকান্দায় ধুমধাম করে বিয়ের পর কনেপক্ষের পক্ষ থেকে বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করার অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে কনের পরিবারের করা অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় দেড় মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন রুমন খন্দকার (২০) নামে এক যুবক। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। রুমনের পরিবারের দাবি, সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি মেনে বিয়ে হওয়ার পর পারিবারিক কলহের জেরে কনেপক্ষ এখন বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ।
স্থানীয় সূত্র ও রুমনের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২২ মে নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের এক কিশোরীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে রুমনের বিয়ে হয়। বিয়েতে গায়ে হলুদ, নাচ-গান, প্রায় ৪০ জন বরযাত্রীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। কনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় পরবর্তীতে প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ে নিবন্ধন করার কথা ছিল বলে দাবি রুমনের পরিবারের।
বিয়ের পর কনেকে রুমনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তারা সেখানে সংসারও শুরু করেন। বিয়ের বিভিন্ন আয়োজনের ছবি ও ভিডিও রুমনের পরিবার সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেছে।
রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, বিয়ের পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। পরে তারা জানতে পারেন, কিশোরীর অন্য এক তরুণের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। একপর্যায়ে কিশোরী বাবার বাড়িতে চলে যান এবং আর স্বামীর বাড়িতে ফিরতে চাননি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাকে একবার ফিরিয়ে আনা হলেও পরে আবার বাবার বাড়িতে চলে যান।
হাফিজুর রহমানের দাবি, এরপর কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় এক মাস পর গত ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ রুমনকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে পরিবার জানতে পারে, কিশোরীর দাদি জহুরন খাতুন রুমনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, গত ১৯ জুন বিকেল ৫টার দিকে বাড়ির পাশ থেকে কিশোরীকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করা হয়। পরে তাকে রুমনদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাতভর ধর্ষণ ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। পরদিন সকালে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান তিনি। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তবে রুমনের পরিবার বিয়ের ছবি ও ভিডিও থাকার দাবি করলেও কিশোরী ও মামলার বাদী জহুরন খাতুন বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তারা মামলার এজাহারে দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ধর্ষণের বিচার দাবি করেছেন। বিয়ের ছবি ও ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
নগরকান্দা থানার ওসি রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, গত ২ জুলাই জহুরন খাতুন তার নাতনিকে নিয়ে থানায় আসেন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ ছিল। তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়েছে।
ওসি আরও বলেন, মামলার এজাহারে বিয়ের কোনো উল্লেখ নেই এবং পুলিশকেও বিয়ের বিষয়ে জানানো হয়নি। কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় আইনগতভাবে এ ধরনের বিয়ের সুযোগ নেই। সামাজিকভাবে বিয়ে হলেও তা আইনগত স্বীকৃতি পায় না। অভিযোগের সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র থাকায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মামলা করা হয়েছে।
তিনি জানান, মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপপরিদর্শক শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
এ বিষয়ে ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, দেশে দুই পরিবারের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিয়ের ঘটনা ঘটে। তবে আইনগতভাবে বাল্যবিবাহের স্বীকৃতি নেই। তার মতে, সামাজিকভাবে বিয়ের পর সংসার করার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগে মামলা হওয়ায় বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়েতে সামাজিক ও আইনি সুরক্ষার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে আইনত নিষিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ হয়ে থাকলে সেটিও আইনবিরুদ্ধ। বিয়ের সঙ্গে কোনো নিবন্ধক বা কাজী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে বিয়ে হয়েছিল কি না, ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা এবং পুরো ঘটনার পেছনে পারিবারিক বিরোধের ভূমিকা কী—এসব বিষয় তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।