শক্তিশালী সৌর দূরবীনে ধরা পড়ল সূর্যের বিরল দৃশ্য, আগে যা দেখা যায়নি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪০ পিএম
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীন ব্যবহার করে সূর্যের পৃষ্ঠের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এই পর্যবেক্ষণে প্রথমবারের মতো সূর্যের পৃষ্ঠে ঘূর্ণাবর্তের মতো এক বিরল প্রাকৃতিক ঘটনা স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়েছে, যা মহাকাশের আবহাওয়া সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, সূর্যের অভ্যন্তরে থাকা অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাসের প্রবাহের কারণে এর চৌম্বক ক্ষেত্র ক্রমাগত মোচড় খায় এবং ঘূর্ণায়মান অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলেই সূর্য থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, যা মহাকাশের আবহাওয়া তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশের এই আবহাওয়া পৃথিবীর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, উপগ্রহ, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং মহাকাশে অবস্থানরত নভোচারীদের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির বিজ্ঞানী ডেভিড ববোল্টজ জানান, সূর্যই মহাকাশের আবহাওয়ার প্রধান উৎস। তাই সূর্যের কার্যপ্রণালি যত ভালোভাবে বোঝা যাবে, ততই ভবিষ্যতে মহাকাশের আবহাওয়ার প্রভাব নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, সূর্যের ক্ষুদ্রতম স্তরের গতিবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেলে মহাকাশের আবহাওয়া নিয়ে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া যাবে। এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীন ইনোউয়ে সোলার টেলিস্কোপ ব্যবহার করেই এই গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। হাওয়াইয়ের একটি উঁচু পাহাড়ে স্থাপিত এই দূরবীন পরিষ্কার আকাশের সুবিধায় সূর্যের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছবি ধারণ করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সূর্যের পৃষ্ঠে ক্ষুদ্র ঘূর্ণায়মান আবর্তের বিস্তারিত চিত্র ধারণ করেছেন।
ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. ডেভিড কুরিডজে বলেন, এই ঘূর্ণন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চৌম্বকীয় শক্তি সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে জমা হয়ে বড় ধরনের সৌর বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা যে ঘটনাটি শনাক্ত করেছেন, তার নাম কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনস্ট্যাবিলিটি। দুটি উত্তপ্ত গ্যাসের স্তর ভিন্ন গতিতে পাশাপাশি প্রবাহিত হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এতে ছোট ছোট আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে ধীরে ধীরে ঘূর্ণাবর্তে রূপ নেয়। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের ছোট ঢেউ বড় ও শক্তিশালী তরঙ্গে পরিণত হওয়ার পেছনেও একই ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে।
গবেষক ড. ফ্রেডরিখ ওয়েগার বলেন, সূর্যের পৃষ্ঠে এই ঘটনার সন্ধান শুধু মহাকাশের আবহাওয়া কীভাবে সৃষ্টি হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রেই নয়; সূর্যের বাইরের স্তর এত বেশি উত্তপ্ত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই আবিষ্কার দেখায় কীভাবে সূর্যের ভেতরের শক্তি ধীরে ধীরে ওপরের স্তরে পৌঁছে যায়। পর্যাপ্ত শক্তি জমা হলে তা হঠাৎ করে সৌর শিখা বা করোনাল মাস ইজেকশনের মাধ্যমে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ডেভিড ববোল্টজের মতে, মহাকাশের আবহাওয়া সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান অর্জন এবং পৃথিবীকে এর সম্ভাব্য প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে এ ধরনের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সূর্য আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র এবং পদার্থবিজ্ঞানের বহু মৌলিক নীতি বোঝার ক্ষেত্রে এটি এক অনন্য গবেষণাগার। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রথম পরীক্ষামূলক প্রমাণও সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল। তাই মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বিস্তারে এ ধরনের গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম।