সমুদ্রের ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে বাবার কবর, জিয়ারতের সেই হৃদয়ছোঁয়া ছবিই পেল পুরস্কার

মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হতে চলেছে বাবার কবর। প্রিয় বাবার শেষ স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো কবর জিয়ারত করছেন এক ছেলে। জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় ভাঙনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা এমনই এক হৃদয়ছোঁয়া আলোকচিত্র এবার পুরস্কার জিতেছে। ছবিটি তুলেছেন ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও আলোকচিত্রী ডা. ইমরান পারভেজ।

রাজধানীর জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালায় সমুদ্র ও উপকূল নিয়ে আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী ‘ওয়েভস অব লাইফ’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে ছবিটি দর্শক ও বিচারকদের নজর কেড়েছে। দর্শকদের ভোট এবং বিচারকমণ্ডলীর মূল্যায়নে ছবিটি প্রতিযোগিতার সেরা আলোকচিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

গত ১৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীতে নদী, সমুদ্র, জলজ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার নানা চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রদর্শনী দেখতে আসা অনেক দর্শনার্থীর হৃদয় ছুঁয়ে যায় বাবার কবর জিয়ারতের এই ছবি। ছবিটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনে সৃষ্ট অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।

দর্শনার্থীদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ পেলেও হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক স্মৃতিচিহ্নের ক্ষতিপূরণ কীভাবে সম্ভব? অর্থ দিয়ে কি বাবার কবর হারানোর বেদনা পূরণ করা যায়?

ছবিটি তোলার পেছনের ঘটনা জানাতে গিয়ে ডা. ইমরান পারভেজ বলেন, ছবিটি সম্ভবত ২০২১ অথবা ২০২২ সালের। সে সময় তিনি ভাসানচরে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। যাতায়াতের পথে তিনি বিভিন্ন স্থানের ছবি তুলতেন।

তিনি জানান, একদিন ভাসানচরে যাওয়ার পথে নোয়াখালীর জনতাঘাট এলাকায় ছবি তোলার সময় তার চোখে পড়ে সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হতে থাকা একটি কবরস্থান। সেখানে অনেকগুলো কবর ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেগুলো সমুদ্রের গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছিল।

সেই সময় তিনি দেখতে পান, এক ছেলে সমুদ্রের দিকে দাঁড়িয়ে একটি কবর জিয়ারত করছেন। কবরটির একাংশ তখনো মাটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে যেকোনো সময় সেটি সমুদ্রে বিলীন হয়ে যেতে পারত। সেই মুহূর্তটিই ক্যামেরাবন্দি করেন তিনি।

ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে ইমরান পারভেজ বলেন, শুধু ওই কবরটিই নয়, পরবর্তী সময়ে সেখানকার পুরো কবরস্থান সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। ওই ঘাটটিও এখন আর নেই। সমুদ্রের ভাঙনে পুরো এলাকাটি হারিয়ে গেছে।

ছবিটি দেখে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, দায়ী দেশগুলোর বোধোদয় হলে বাংলাদেশ হয়তো কোনো একসময় ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন পেতে পারে। কিন্তু বাবার কবর হারানোর ক্ষতির ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেওয়া সম্ভব? কোটি টাকা পেলেও কি কেউ নিজের বাবার কবর বিক্রি করতে চাইবেন?

আতিকুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ অনেক মূল্যবান সম্পদ হারাচ্ছে, যার ক্ষতি অর্থনৈতিক মূল্য দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। ছবিটি সেই বাস্তবতারই একটি প্রমাণ। তার মতে, ছবিটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা উচিত, যাতে মানুষ বুঝতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ও শারীরিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনেও অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।

‘ওয়েভস অব লাইফ’ শীর্ষক এই জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করে ইয়ুথ ফর ওশান, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশ। পাঁচ দিনব্যাপী এ আয়োজনে শতাধিক আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়। বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঘটে।

প্রদর্শনীতে তরুণ আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় ধারণ করা প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়। জলজ বাস্তুতন্ত্রের সংকট, জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনে সৃষ্ট প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ছিল এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রতিযোগিতায় জলজ জীবিকা ও উপকূলীয় দূষণ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ইমরান পারভেজ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সাঈদ আব্বাস। জ্বালানি ও পরিবেশ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন রাজীব রাইহান।

এ ছাড়া তিনটি বিভাগে রানারআপ হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন মোহাম্মদ আমদাদ হোসাইন, মোহাম্মদ তাহিদুল ইসলাম ও আয়মান নাকিব। বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছেন জাকির হোসাইন, গালীব রহমান নাদিম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও আয়মান নাকিব।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও সমুদ্রবেষ্টিত দেশ। বঙ্গোপসাগর, উপকূলীয় অঞ্চল, নদনদী ও জলাভূমি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব সম্পদ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক ও বর্জ্যদূষণ, অপরিকল্পিত সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের প্রাকৃতিক প্রতিবেশ নানা সংকটের মুখে পড়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

আলোকচিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে ফরিদা খানম বলেন, অনেক সময় দীর্ঘ বক্তব্যের মাধ্যমে যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় না, একটি ছবি মুহূর্তেই মানুষের হৃদয় ও বিবেককে নাড়া দিতে পারে। পরিবেশবিষয়ক আলোকচিত্র প্রকৃতির সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং দূষণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ছবি ধারণ ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠা, যথাযথ প্রেক্ষাপট এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা সংগঠনের সদস্য সচিব এবং ইয়ুথ ফর ওশানের উপদেষ্টা শরীফ জামিল। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন সার্ক কৃষি কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা আবুল বাশার মিরাজ, মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক কেফায়েত শাকিল, জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ, মাকজিওন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, সামুদ্রিক অভিযাত্রী ও সেভ আওয়ার সি-এর পরিচালক সুফি মো. আতিকুর রহমান, আলোকচিত্রী সাঈদ আব্বাস এবং আয়মান নাকিবসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, ‘ওয়েভস অব লাইফ’ কেবল একটি আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী নয়, বরং তরুণদের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নতুনভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ। এ ধরনের আয়োজন পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে নদী, সমুদ্র ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করবে।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের দেড় শতাধিক আলোকচিত্রী প্রতিযোগিতার তিনটি বিভাগে প্রায় ৬০০টি ছবি জমা দেন। সেখান থেকে বিচারকদের মূল্যায়নে ১০৫টি ছবি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়।

প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আলোকচিত্রী ও আলোকচিত্র শিক্ষাবিদ আবির আবদুল্লাহ, জার্মানির হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সমুদ্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মফিজ রহমান এবং ধরিত্রী রক্ষায় আমরা সংগঠনের সদস্য ও রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ।

প্রকাশক: মাহমুদুল হাসান

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সুজন মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক: শরিফুল ইসলাম

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: ২/এ, কালাচাঁদপুর মেইন রোড, ঢাকা- ১২১২

ইমেইল: monojogprokashnews@gmail.com

মোবাইল: 09658369970