নিজ দলেই তোপের মুখে দেশে ফেরা নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাহাদুর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:২০ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরেই নিজ দল নেপালি কংগ্রেসে নতুন করে বিরোধের মুখে পড়েছেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা। তার ঘনিষ্ঠ নেতারা তাকে আবারও দলের সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করে তার নেতৃত্বে ১৫তম সাধারণ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিলেও দলের একটি অংশ এতে আপত্তি জানিয়েছে।

নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ১৭ এপ্রিলের রায় পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ার পর। ওই রায়ে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে দলের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

দেউবা-ঘনিষ্ঠ নেতাদের মতে, এখন দলের সামনে দুটি পথ রয়েছে—সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করা অথবা দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ সম্মেলনের আয়োজন করা।

দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতা প্রকাশ শরণ মহাত বলেন, আদালতের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করা যেতে পারে। আবার ১৪তম সাধারণ সম্মেলনে দেউবার নেতৃত্বে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিকে গ্রহণ করে পরবর্তী সাধারণ সম্মেলনের দিকেও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

তার মতে, স্বাভাবিকভাবেই ১৫তম সাধারণ সম্মেলন দেউবার নেতৃত্বেই হওয়া উচিত। বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকে তিনি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মহাত আরও বলেন, আদালত আগের রায় পুনর্বিবেচনায় সম্মত হওয়ায় অপর পক্ষ যদি দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ সম্মেলন করতে রাজি থাকে, তাহলে চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। এর মাধ্যমে দলের ঐক্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

দেউবার নেতৃত্বে দলের বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে একত্র করা সহজ হবে বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেউবার নেতৃত্বে সবাই একসঙ্গে আসতে পারবেন এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা কোণঠাসা করা হবে না।

পাঁচ মাস পর দেশে ফিরলেন দেউবা

পাঁচবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দুই মেয়াদে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট নেপালে ফেরেন।

বিমানবন্দর থেকে তিনি কাঠমান্ডুর চুন্ডেভিতে তার সমর্থকদের যোগাযোগ কার্যালয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়েছিলেন। তাদের অনুরোধে সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন দেউবা।

এ সময় তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। অভিযোগগুলোর ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেউবা বলেন, রাজতান্ত্রিক পঞ্চায়েত আমল, রাজা জ্ঞানেন্দ্রর শাসন কিংবা বর্তমান সরকারের সময়ও তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

দেশে ফেরার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে দলীয় বিরোধ ও অসন্তোষের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান তিনি। নেপালি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে বলেও সতর্ক করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

তরুণ নেতাদের সামনে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের অযোগ্য বা মূল্যহীন হিসেবে উপস্থাপনের বিরোধিতা করেন দেউবা।

বিশেষ সম্মেলন ঘিরেই নেতৃত্ব সংকট

নেপালি কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্ব সংকটের সূত্রপাত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে ঘিরে। ওই সম্মেলনে গগন থাপাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে স্বীকৃতি দিলে দেউবা শিবির এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায়।

১৭ এপ্রিল আদালত থাপার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

এরপর দেউবা শিবির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। প্রাথমিক পর্যালোচনার পর ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি নথিভুক্ত করে। পরে আদালত পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ায় দলটির নেতৃত্ব নিয়ে আইনি জটিলতা আবারও সামনে আসে।

দেউবাকে ফেরানোর প্রস্তাবে আপত্তি থাপা শিবিরের

দলের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ পৌডেল দেউবাকে আবার সভাপতি করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি বলেন, বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের বৈধ প্রক্রিয়ায় যে নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে আবার সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করে সাধারণ সম্মেলনে যাওয়া আইনগত, প্রক্রিয়াগত ও রাজনৈতিক কোনো দিক থেকেই যুক্তিসঙ্গত নয়।

পৌডেলের মতে, দেউবা দুই মেয়াদে দলের সভাপতি ছিলেন। এখন তার উচিত দলীয় গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে দলের বৃহত্তর ঐক্যের জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা।

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের শুরুতে গগন থাপা দেউবার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানান। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া দেউবা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরায় তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর কথা বলেন তিনি।

দেউবার বিরুদ্ধে অর্থপাচার তদন্তও চলছে

দলীয় নেতৃত্বের সংকটের পাশাপাশি দেউবার আইনি জটিলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিদেশে থাকার সময় দেশটির অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে তদন্ত শুরু করে।

দেউবা ও তার স্ত্রী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধে কাঠমান্ডু জেলা আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তবে ২৫ মে সুপ্রিম কোর্ট তাদের গ্রেপ্তার না করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি নেই। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাও দেউবা দম্পতির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

তবে অর্থপাচার তদন্ত এখনো চলছে। জুলাইয়ে তদন্তকারীরা বিশেষ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে দেউবার ছেলে জয়বীর দেউবার মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালি রুপির একটি লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ফলে দেশে ফেরার পর শের বাহাদুর দেউবার সামনে এখন একসঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ—দলের নেতৃত্বের বিরোধ মেটানো, গগন থাপা শিবিরের সঙ্গে সমঝোতা করা এবং চলমান অর্থপাচার তদন্ত মোকাবিলা করা।

প্রকাশক: মাহমুদুল হাসান

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: জাহিদুল ইসলাম

বার্তা সম্পাদক: শরিফুল ইসলাম

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: ২/এ, কালাচাঁদপুর মেইন রোড, ঢাকা- ১২১২

ইমেইল: monojogprokashnews@gmail.com

মোবাইল: 09658369970