মানবতাবিরোধী অপরাধে ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ ৭ নেতার রায় যেকোনো দিন
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৫ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। ফলে মামলাটির রায় এখন যেকোনো দিন ঘোষণা করতে পারেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেলে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি এবং পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষ হয়।
এদিন প্রথমে আইনগত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মামলায় দাখিল করা অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে এসবের প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।
এর জবাবে ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী এম হাসান ইমাম। তিনি দাবি করেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তার তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং অবস্থানে ছিলেন না। তাই তারা কাউকে হত্যা করেননি বা হত্যার নির্দেশও দেননি।
এরপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তি খণ্ডন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তার চার মক্কেল হলেন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান এবং যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল।
ইশরাত জাহানের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার চার মক্কেলের নাম ছিল না। তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন- এমন কোনো প্রমাণও প্রসিকিউশন দেখাতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না। এ মামলায় নারীদের আহত হওয়ার কথা বলা হলেও কোনো নারী সাক্ষী আনা হয়নি বলেও আদালতে উল্লেখ করেন তিনি।
নিজের চার মক্কেলের খালাস দাবি করে এই আইনজীবী বলেন, শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে তারা আন্দোলন ঘিরে কিছু বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রসিকিউশনের দাখিল করা কোনো ভিডিওতেই তাদের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
আসামিপক্ষের যুক্তি শেষে পাল্টা যুক্তি খণ্ডন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তিনি যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগের আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে মামলার আসামিদের দায় সম্পর্কে ট্রাইব্যুনালে যুক্তি উপস্থাপন করেন। আন্দোলন দমনের অভিযানে একজন মানুষ নিহত হলেও সংশ্লিষ্ট আসামিরা অপরাধের দায়ে পড়বেন বলে আইনি যুক্তি দেন তিনি।
এর আগে ১২ আগস্ট সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা দাবি করে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষকে হত্যা ও আহত করার জন্য আসামিরা দায়ী বলেও দাবি করেন তিনি।
এই মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অনুকম্পা না দেখিয়ে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
গত ৪ আগস্ট মামলাটিতে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিন মামলার সামগ্রিক পটভূমি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর টানা পাঁচ কার্যদিবসে সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আইনি যুক্তি উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
মামলার সাত আসামি হলেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান। তারা সবাই বর্তমানে পলাতক।
গত ২ আগস্ট মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন একই ট্রাইব্যুনাল।