সম্পূর্ণ বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী পাঠাবে সরকার
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। নতুন এই ব্যবস্থায় কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমানো, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, আগ্রহী কর্মীরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। পাশাপাশি অনুমোদিত চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর সুযোগ থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। এ কারণে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় কার্যকর করা এবং স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও অংশগ্রহণমূলক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আগে যে ব্যবস্থা ছিল
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন ও তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে কর্মী নিয়োগকারী অন্যান্য দেশকেও দেশটির নিজস্ব নীতিমালা ও যোগ্যতার শর্ত অনুসরণ করতে হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আলোচনার একপর্যায়ে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু শর্তে নমনীয়তা দেখায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। কারণ, প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত কয়েকটি শর্ত পূরণ করা বাংলাদেশের অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য কঠিন ছিল।
এর ধারাবাহিকতায় প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ও সহায়ক দলিলসহ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগ
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালু এবং সম্প্রসারণের বিষয়টিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য দেশটিকে বেছে নেন। সফরে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেন।
সরকারের লক্ষ্য শুধু শ্রমবাজার চালু করা নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সর্বোচ্চসংখ্যক বৈধ ও যোগ্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা এবং অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
এ লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যায়। আলোচনায় মালয়েশিয়ার আইন, নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড ও বিদ্যমান সমঝোতার প্রতি সম্মান রেখে বাংলাদেশের বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সি তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ তাদের নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি বেসরকারি প্রক্রিয়াকরণ বা সেবা প্রদানকারী এজেন্সি এবং আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। সব মিলিয়ে এজেন্সির সংখ্যা ৩৩৮টি।
তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ায় নিয়োগকর্তা খুঁজতে পারবে। পাশাপাশি চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ, বাংলাদেশে কর্মী নির্বাচন এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রণালয়ের মতে, এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর ফলে শ্রমবাজারে আরও উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
যেভাবে পরিচালিত হবে নিয়োগ প্রক্রিয়া
নতুন ব্যবস্থায় প্রথমে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে কর্মী নির্বাচন এবং নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
পরবর্তী ধাপে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায় বোয়েসেলসহ তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রক্রিয়াকরণ ও সেবা প্রদানকারী এজেন্সি প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
মালয়েশিয়ার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম শেষ করবে। প্রতিটি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি নিজস্ব নিয়োগকৃত কর্মীদের জন্য নিজেদের লাইসেন্সের অধীনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিতে পারবে।
বোয়েসেল এবং অন্য ২৫টি প্রক্রিয়াকরণ ও সেবা প্রদানকারী এজেন্সি প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্রের জন্য তারা অনুমোদিত এজেন্সিকে অনাপত্তিপত্র দিতে পারবে। এর মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নিজস্ব দায়িত্ব, জবাবদিহি ও ব্যবসায়িক স্বাধীনতা বজায় রাখার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষায় গুরুত্ব
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন নিয়োগব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হবে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানো এবং নিরাপদ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নতুন চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে সব কার্যক্রম দেশের প্রচলিত আইন মেনে এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে পরিচালনা করতে হবে।
চিকিৎসাকেন্দ্র অনুমোদনে চলছে প্রক্রিয়া
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত চিকিৎসাকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ এখনো চলমান। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, চিকিৎসাকেন্দ্র চূড়ান্ত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ।
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান চিকিৎসাকেন্দ্রের তালিকা পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে সরেজমিনে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করার পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। এ কারণে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
এ অবস্থায় মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশের অনুরোধে ফ্যাসিবাদ ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট তালিকাভুক্ত কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি শ্রমবাজার চালুর পর যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো যাচাই-বাছাই করবে এবং পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু করবে।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় থাকবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন চিকিৎসাকেন্দ্র তালিকায় যুক্ত করা হবে। নতুন কেন্দ্র অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ও তালিকা ঘোষণা করবে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় থাকবে না একক নিয়ন্ত্রণ
মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন এবং অনুমোদিত চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারবেন।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না। কর্মীরা যাতে সহজে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পান, সে লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকার ও মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ
এই অগ্রগতি অর্জনে দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে সহযোগিতা ও ইতিবাচক মনোভাবের জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সুযোগ সফল করতে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি ও কর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারের লক্ষ্য শুধু মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নয়, বরং আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈধ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলা।