মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের অনুপযুক্ত স্পর্শ ও নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না: আজহারি

মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাসনের নামে শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো, অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি এবং অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক ড. মিজানুর রহমান আজহারি। একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।

পোস্টে মিজানুর রহমান আজহারি বলেন, দেশে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে মাদ্রাসাগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। অসংখ্য আলেম, আলেমা ও ধর্মপ্রাণ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী, নিরাপদ ও আস্থাশীল করতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে প্রভাবশালী আলেম, দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং মাদ্রাসা পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের খোলামেলা আলোচনা ও আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। নিজেদের ভুল নিজেরা সংশোধন না করলে অন্য পক্ষ সেই সুযোগ নিতে পারে। এতে সামগ্রিক মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা অযাচিত চাপ ও সংকটের মুখে পড়তে পারে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে অপর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাদ্রাসা এবং হিফজখানা গড়ে ওঠার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আজহারি। তার ভাষ্য, অনেক প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা, যথাযথ তদারকি, মানসম্মত পরিবেশ ও উন্নত পাঠদানব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মাদ্রাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে এসব প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতা, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুমোদন, নিবন্ধন, মানসম্মত পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, নিরাপদ অবকাঠামো, নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং কার্যকর পরিচালনাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখার আহ্বান জানান।

শিক্ষকদের শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ হলেই চলবে না উল্লেখ করে আজহারি বলেন, শিক্ষার্থীদের বয়স, মানসিক বিকাশ, আবেগ ও শেখার ধরন বুঝে তাদের সঙ্গে মানবিক ও বয়সোপযোগী আচরণ করার সক্ষমতাও শিক্ষকদের থাকতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষক নিবন্ধন, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনার পরামর্শ দেন।

মাদ্রাসায় শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত ও নির্যাতনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের মনে ভয়, অপমান ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত তৈরি করতে পারে বলে উল্লেখ করেন আজহারি। তার মতে, এ ধরনের আচরণ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও মানবিকতার ভিত্তিতে।

তিনি বলেন, জোর করে বিদ্যা চাপিয়ে দেওয়ার নাম শিক্ষা নয়, বরং শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ নিশ্চিত করা।

শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রতিটি মাদ্রাসায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানান আজহারি। এসব নীতিমালায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ আচরণ, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের পদ্ধতি এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

শিক্ষার্থীরা যাতে নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। গুরুতর নির্যাতনের ঘটনা গোপন না রেখে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আজহারি বলেন, শাসনের নামে ভয় দেখানো, অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি কিংবা অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি একান্তে সাক্ষাৎ ও ব্যক্তিগত বার্তার ক্ষেত্রেও নিরাপদ এবং পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখতে হবে।

গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের পুনরায় একই ধরনের দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তবে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তিনি।

মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারে আলেম ওলামা, পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন আজহারি। সীমিত সামর্থ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

পোস্টের শেষাংশে আজহারি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার সমালোচনা নয়, বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা রক্ষাই এ আলোচনার উদ্দেশ্য। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ঐতিহ্য বা সুনামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং পরিচালনব্যবস্থার স্বচ্ছতার মধ্যেও তা নিহিত।

নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আত্মসমালোচনা, জবাবদিহিতা ও সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং দায়িত্বশীলতার পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা ও সামাজিক আস্থা অটুট রাখতে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন মিজানুর রহমান আজহারি।

প্রকাশক: মাহমুদুল হাসান

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সুজন মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক: শরিফুল ইসলাম

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: ২/এ, কালাচাঁদপুর মেইন রোড, ঢাকা- ১২১২

ইমেইল: monojogprokashnews@gmail.com

মোবাইল: 09658369970