প্যারালাইসিস রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী ‘রোবোটিক হ্যান্ড স্যুট’ উদ্ভাবন রোবোলাইফের

নিজস্ব প্রতিবেদন

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মানুষের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্য নিয়ে অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উদ্যোগ নিয়েছে ‘রোবোলাইফ’ (Robolife) টিম। জোবরা গ্রামের সন্তান লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর গবেষক দল তৈরি করেছেন সাশ্রয়ী মূল্যের বিশেষ ‘রোবোটিক হ্যান্ড স্যুট’। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের হাত ও আঙুলের নড়াচড়ার অনুশীলনে সহায়তা করা এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ধারাবাহিক করাই এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য।

প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশের পাশাপাশি হাত ও আঙুলের স্বাভাবিক নড়াচড়া সীমিত হয়ে যায়। কারও ক্ষেত্রে হাতের পেশিতে দুর্বলতা তৈরি হয়, আবার কেউ হাত ও আঙুল স্বাভাবিকভাবে নাড়াতে পারেন না। এর ফলে খাওয়া, পোশাক পরা, কোনো কিছু ধরা, লেখা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদনের মতো স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অনেকের আত্মবিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্যারালাইসিসের পর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও ব্যায়ামের গুরুত্ব রয়েছে। তবে দেশের অনেক রোগীর পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত চিকিৎসাকেন্দ্র বা ফিজিওথেরাপি সেন্টারে যাতায়াত করা সম্ভব হয় না। চিকিৎসার ব্যয়, বাসস্থান থেকে দূরত্ব, যাতায়াতের অসুবিধা এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক রোগী প্রয়োজনীয় থেরাপি ও ব্যায়াম নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারেন না। ফলে পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মানুষের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং তুলনামূলক কম খরচের একটি প্রযুক্তি তৈরির উদ্যোগ নেয় রোবোলাইফ টিম। লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর সহকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, নকশা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এমন একটি ডিভাইস তৈরির কাজ শুরু করেন, যা রোগীর হাত ও আঙুলের নড়াচড়ার অনুশীলনে সহায়তা করতে পারে। ধারাবাহিক গবেষণা ও প্রচেষ্টার পর সম্প্রতি তাঁরা ডিভাইসটির একটি প্রাথমিক প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

রোবোলাইফের তৈরি ‘রোবোটিক হ্যান্ড স্যুট’ মূলত রোগীর হাত ও আঙুলকে নির্দিষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নড়াচড়া করাতে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। রোগীর শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হাত ও আঙুলের বিভিন্ন ধরনের মুভমেন্ট করানোর মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের জড়তা কাটিয়ে ওঠার অনুশীলনে এটি সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত হাতের ব্যায়াম করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় পুনর্বাসন কার্যক্রমকে আরও ধারাবাহিক করার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

উদ্ভাবকদের ধারণা, এ ধরনের প্রযুক্তি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের হাতের নড়াচড়া অনুশীলনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যায়ামের মাধ্যমে হাতের জড়তা কমানো, পেশির কার্যক্ষমতা ধরে রাখা এবং হাতের নড়াচড়ার সক্ষমতা উন্নত করার প্রচেষ্টায় এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ডিভাইসটির চিকিৎসাগত কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা, ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসক ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোবোলাইফ টিমের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিটিকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে দেশের সাধারণ মানুষও এটি ব্যবহারের সুযোগ পান। বর্তমানে বাজারে থাকা বিভিন্ন ধরনের রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন ডিভাইসের অনেকগুলোই তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। ফলে সীমিত আয়ের রোগীদের জন্য এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই জায়গায় স্থানীয়ভাবে তৈরি অপেক্ষাকৃত কম খরচের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে দেশের প্যারালাইসিস রোগীদের পুনর্বাসন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর গবেষক দলের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর লক্ষ্য। তাঁদের মতে, একটি প্রযুক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে মানুষের উপকারে আসে, যখন সেটি মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে। সেই চিন্তা থেকেই তাঁরা রোবোটিক হ্যান্ড স্যুটকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত পণ্য হিসেবে নয়, বরং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মানুষের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছেন।

উদ্ভাবকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ডিভাইসটি এমনভাবে উন্নত করা হবে, যাতে রোগী চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের বাড়িতেও হাত ও আঙুলের নির্দিষ্ট ব্যায়াম করতে পারেন। এতে নিয়মিত থেরাপি নেওয়ার পাশাপাশি বাড়িতে অনুশীলনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগীর পক্ষে প্রতিদিন চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব নয়, তাঁদের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকর সহায়ক ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে।

তবে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এই প্রযুক্তিকে সরাসরি চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা। বরং চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানের সঙ্গে সমন্বয় করে এটি ব্যবহার করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীর শারীরিক অবস্থা, পেশির সক্ষমতা ও নড়াচড়ার সীমাবদ্ধতা এক রকম নয়। তাই রোগীর অবস্থা বিবেচনা করেই ডিভাইসটির ব্যবহার ও ব্যায়ামের ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক প্রোটোটাইপ তৈরির পর এখন সেটিকে আরও উন্নত, নিরাপদ, কার্যকর ও ব্যবহারবান্ধব করার কাজ করছে রোবোলাইফ টিম। রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিভাইসটির কার্যকারিতা বাড়ানো, নকশায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা, ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী ধাপের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রোবোলাইফ টিমের এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি বড় সামাজিক সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা। উন্নত প্রযুক্তির অনেক রিহ্যাবিলিটেশন ডিভাইস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় এবং সেগুলোর মূল্যও অনেক বেশি। স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে প্রয়োজনীয় ডিভাইস তৈরি করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এর সুবিধা পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পর্যাপ্ত গবেষণা এবং প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল ও ব্যবহারিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ডিভাইসটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এটি প্যারালাইসিস রোগীদের পুনর্বাসনে একটি সম্ভাবনাময় সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন এমন রোগীদের জন্য বাড়িতে নিয়মিত হাতের ব্যায়ামের সুযোগ তৈরি হলে চিকিৎসা-পরবর্তী অনুশীলন আরও সহজ ও ধারাবাহিক হতে পারে।

লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর দলের স্বপ্ন শুধু একটি রোবোটিক ডিভাইস তৈরি করা নয়; বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে শারীরিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনকে আরও সহজ করে তোলা। একজন রোগী যেন নিজের হাতের নড়াচড়া নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হতে পারেন, দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারেন এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় নিয়মিত যুক্ত থাকতে পারেন-এই লক্ষ্যেই ডিভাইসটির উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে রোবোলাইফ।

প্রাথমিক প্রোটোটাইপ থেকে পূর্ণাঙ্গ ও ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে পৌঁছাতে এখনও আরও গবেষণা, পরীক্ষা ও উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে জোবরা গ্রামের সন্তান লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর গবেষক দলের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের একটি সম্ভাবনাময় উদাহরণ তৈরি করেছে। উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে দেশের প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের পুনর্বাসন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

সাশ্রয়ী মূল্যে দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে প্যারালাইসিস রোগীদের হাতের নড়াচড়ার অনুশীলন সহজ করা গেলে শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোই নয়, রোগীদের আত্মবিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনে স্বনির্ভরতা ফেরাতেও তা ভূমিকা রাখতে পারে। আর সেই লক্ষ্যেই রোবোলাইফের এই উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছাবে-এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকাশক: মাহমুদুল হাসান

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সুজন মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক: শরিফুল ইসলাম

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: ২/এ, কালাচাঁদপুর মেইন রোড, ঢাকা- ১২১২

ইমেইল: monojogprokashnews@gmail.com

মোবাইল: 09658369970