রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে চাঁদা না দিলেই গুলি, ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ অপরাধ নেটওয়ার্ক
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম
রাজধানী শহর ঢাকা। যেখানে কোটি মানুষ প্রতিদিন জীবন চালায়। কিন্তু তাদের অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে অন্য কেউ। দিনের আলোয় চলে অন্ধকারের খেলা। আপনি কোথায় ব্যবসা করবেন; কত টাকা আয় করবেন; এমনকি বাঁচবেন কি না; সবকিছুর ওপরই রয়েছে এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। এদের দেখা যায় না, ধরা যায় না, কিন্তু ছাঁয়া আছে সবখানে। এখানে নিয়ম ঠিক করে অন্য কেউ; ভয় এখানে দৈনন্দিন বাস্তবতা। কিন্তু কেন?
উত্তর জানতে চলুন সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার দিকে নজর দেয়া যাক। দেখে নেয়া যাক রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অচেনা জগত।
১০ জুন, ২০২৫: পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প। হাতে হ্যান্ডকাফ, গলায় ধারালো ছুরির আঘাত। ভিকটিম রাকিবুল ইসলাম সানি ওরফে পেপার সানি। এই হত্যাকাণ্ড শুধুই কি খুন? নাকি একটি বার্তা?
১০ নভেম্বর ২০২৫: আদালত চত্বরে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি। টার্গেট তারিক সাঈফ মামুন। খুনের চুক্তি মাত্র ২ লাখ টাকা। একটি জীবন কি এত সস্তা?
১৭ নভেম্বর ২০২৫: একটি স্যানিটারি দোকান, সিসিটিভি ক্যামেরার কিছু দৃশ্য। কয়েক সেকেন্ডেই শেষ যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়ার জীবন।
ঘটনাগুলো আলাদা মনে হলেও, আসলে কি তাই? নাকি সবগুলোই একটি নেটওয়ার্কের অংশ? পল্লবীর যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দিয়েই, উত্তর খোঁজার চেষ্টায় নামে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই প্রাণ দিতে হয়েছে যুবদল নেতা কিবরিয়াকে- এমন অভিযোগ পরিবারের।
তার স্ত্রী বলেন, তারা হুমকি মনে করছিল, ‘যদি কিবরিয়া এগিয়ে যায় তাহলে তাদের পজিশন নরবড়ে হয়ে যাবে। এই ভয়টা তাদের মধ্যে কাজ করছে, এজন্য হয়তো সন্ত্রাসীদের দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডটা ঘটিয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের কানেকশন তো অবশ্যই আছে। যে সব আসামিরা এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের ভাষ্যমতে, তারা মামুন ও তার ছোট ভাই মশিউরের লোক।’
কিবরিয়ার মেয়ে বলেন, ‘আমাদের জীবন এখনো শুরু হয়নি তার আগে বাবা ছেড়ে চলে গেছে। একটারও যদি বিচার হতো মানুষ ভয় পাইতো।’
এদিকে এ হত্যায় জড়িত ৫ জনের ৪ জনকেই গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তারা বলছেন, চাঁদাবাজি-দখলদারিত্বসহ নানা বিষয়ে বাধা দেওয়ায় ভাড়াটে খুনি দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এই হত্যাকান্ডগুলোয় নাম আসা সন্ত্রাসীরা শুধুই কি ভাড়াটে খুনি? চলতে থাকে আমাদের অনুসন্ধান।
রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর এলাকা। জনবহুল হওয়ার পাশাপাশি রয়েছে শিল্প কারখানা, পরিকল্পিত আবাসন ও বিহারী ক্যাম্প। স্টার নিউজের অনুসন্ধান বলছে, এসব এলাকার অপরাধ জগৎ সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র।
গেল বছর জুলাইয়ে পল্লবীর একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। গুলিবিদ্ধ হন প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা। আহতও হন বেশ কয়েকজন। আমরা কথা বলি এক প্রত্যক্ষর্শীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ৫ কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছিল পল্লবী থানার মামুন ও জামিল। সর্বশেষ ৩টা ফায়ার করছে, যাকে টার্গেট করেছে তার পায়ে গুলি করে চলে গেছে।’
এলাকার ব্যবসায়ী মহলেরও দাবি, এই নামগুলো নতুন নয়। তারা প্রথমে চাঁদা দাবি করে, এরপর আসে হুমকি এবং সবশেষে হামলা। সবই চলে একটি পরিচিত প্যাটার্নে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো এই অপরাধ চক্র নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খোলেন না।
এ নিয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় একজন বলেন, ‘ভাই এগুলো নিয়ে কথা বলে লাভ কী, আপনারা কিছু করতে পাবেন?’
আরেকজন বলেন, ‘কাজ করি, খাই-দাই, আর কিছু জানি না। আমাদের বলা হয়েছে, তুমি কাজ করো। দিন শেষে টাকা নিয়ে যাবে।’
কিছু দিন আগে চাঁদার হুমকি পাওয়া এক ব্যবসায়ী পরিচয় গোপন রেখে কথা বলেন স্টার নিউজের সাথে। তিনি বলেন, ‘বিদেশি নাম্বার থেকে ফোন আসে। নামটা বলতে ভয় পাইতেছি, আমার নিজের জীবনেরও ভয় আছে। মীমাংসা করতেই হবে। মৃত্যুর ভয়ে চাঁদা দিচ্ছি। চাঁদা না দিয়ে অথবা তাদের সঙ্গে সমঝোতা না করেও কোনো উপায় নাই। প্রশাসনকে জানালেও বিদেশি নাম্বার ট্রেস করতে পারে না। বিদেশি নাম্বারের এগেনেস্টে কোনো অ্যাকশনে যেতে পারে না।’
আমরা খুঁজে বের করি আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীকে, যারা নানাভাবে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘বাড়ি করতে গেলে তাদের চাঁদা দিতে হবে নাহলে বাড়ি করতে দেবে না। ছুড়ি ও চাপাতি দেখানো হয়। বলে, তোরা অভিযোগ করলে হাত-পা কেটে ফোলবো। এরকম অহরহ হচ্ছে। এরা হচ্ছে- মামুন, ইব্রাহিম, শাহাদাত, মোক্তার, হাড্ডি সোহাগ এই ৪/৫ জন। পুরা পল্লবী থানা এলাকাজুড়ে তাদের রাজত্বে চলে। ব্যবসা করতে হলে তাদের টাকা দেওয়া লাগবে। তা না হলে ব্যবসা করা যাবে না। মনে, পুরা রাজত্ব, দুনিয়া ওদের। এদের ভয়ে অনেকে মুখ খোলে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই তাদের কাছে জিম্মি। তাদের সবাই ভয় পায়। ব্যাবসা বা কোন কিছু করতে হলে তাদের টাকা দিতে হবে। আমরা কার কাছে যাবো? প্রশাসন কিছু করে না। তাদের লোকজন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। অস্ত্র নিয়ে আসে হুট করে বলে টাকা দে। দিলে ব্যাবসা করা যাবে না দিলে যাবে না।’
এভাবে ভাড়াটে খুনি, মাদক, টেন্ডারবাজি, পরিবহন, ভূমিদখল, চাঁদাবাজিসহ চক্রটির অন্তত ১৫ ধরনের অপরাধের তথ্য মিলেছে স্টার নিউজের অনুসন্ধানে। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান, বার বার চেষ্টা আর ব্যর্থতার পর এক ব্যক্তির খোঁজ পায় স্টার নিউজ। ক্যামেরার সামনে মুখ দেখাতে রাজি নন। কিন্তু তার বক্তব্যেই উঠে আসে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভেতরের বাস্তবতা। যেখানে তাদের প্রতিটি অপরাধের নেপথ্যে রয়েছে, নির্দিষ্ট কাঠামো।
তিনি বলেন, ‘ধরেন, একটা লোককে মারার কনট্রাক্ট আসছে। সেই কনট্রাক্টটা নেওয়ার পর তারা কাউরে ফোন দেয়। দিয়ে বলে, এই লোকের ছবি দিলাম অমুক এলাকায় থাকে, তারপর অস্ত্র পাঠায়, অনেক সময় অস্ত্র ভাড়া দেয় তারপর কাজটা সমাধান করে। অনেক সময় মারার ভয় দেখিয়ে চাঁদা চায়। এভাবে সিন্ডিকেটটা চালায়।’
স্টার নিউজের অনুসন্ধান বলছে, মূলত চারজন সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণ করছে, এই অপরাধী গোষ্ঠী। মফিজুর রহমান মামুন ওরফে কালশী মামুন; ইব্রাহিম ওরফে কিলার ইব্রাহিম; শাহাদাত হোসেন এবং মোক্তার হোসেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডে যারা পরিচিত ফোর স্টার গ্রুপ নামে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, ‘মূলকথা হলো তারা তাহলে টাকা দিতেই হবে। টাকা না দিলে ব্যবসার ক্ষতি করে, গুলি করে। যেটা করলে মানুষ আতঙ্কে থাকবে, তখন মানুষ টাকা দিয়ে দেয়। অনেক সময় কাজটা ফোরস্টারের এক একজন নিজের মতো করে, বড় কাজ হলে সবাই মিলে একসঙ্গে করে। জমিজমা, বিভিন্ন সমস্যা অনেক সময় থাকে যেগুলো আদালতের মাধ্যমে সমাধান হয় না। এই সমস্ত বিষয়ের খোঁজ খবর পেলে তখন গিয়ে দখল করে, অথবা কারও পক্ষে গিয়ে দখল করে। আবার বাড়িঘর করতে গেলে মানুষের কাছ থেকে চাঁদা চাওয়া হয়। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে প্রথমে হুমকি, পরে প্রয়োজনে গুলি করে।’
বোঝাই যাচ্ছে, একটি সংগঠিত কাঠামোর মধ্যেই চলছে মিরপুর এলাকার অপরাধ সাম্রাজ্য। যেখানে নিয়ম আছে, বণ্টন আছে, রয়েছে নিয়ন্ত্রণও।
ঘর থেকে বের হয়ে জীবন নিয়ে কেউ ফিরতে পারবে কিনা তার কোন গ্যারান্টি নাই। বছরের পর বছর এই সমস্যা চলছে দেখার কেউ নাই।
দীর্ঘ ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কামরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘যারা ব্যবসায়ী তারা এদের কাছে জিম্মি। ওরা শিকার হিসেবে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে।’
তার মতে, এই অপরাধী সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত; যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুরো ব্যবস্থাই জিম্মি।
কামরুল হাসান বলেন, ‘অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগসাজশ ছিল, হয়ত এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। এরা একটা প্রশ্রয় পায়। দ্বিতীয়ত, এদের সঙ্গে একটা আর্থিক লেনদেন থাকে। যেমন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৬ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ প্রায় ২১ জন সন্ত্রাসী জেল থেকে বেড়িয়ে গেলো। কীভাবে বের হলো এরা? আজকে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে খারাপ অবস্থা, এটা তো তার ফল। তখন যদি তারা দেশ ছাড়া না হতো, তাহলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের যে পরিস্থিতি তা হতো না।’
এই বিশ্লেষকের মতে, প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতা আর বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এই অপরাধ ঠেকানোর মূল বাধা। এক্ষেত্রে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোরও দায় দেখছেন তিনি।
কামরুল হাসান বলেন, ‘রাষ্ট্র চাইলে এসব নির্মূল করা কোনো ব্যাপারা না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র চায় না। বা রাষ্ট্রের কিছু লোকের সঙ্গে যোগসাজশ থাকে, যে কারণে নির্মূল হয় না।’
এতক্ষণে আমরা দেখেছি খুন, চাঁদাবাজি আর আতঙ্কের চিত্র। এবার উন্মোচন করা যাক- কাদের মাধ্যমে ফোরস্টার গ্রুপ আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার মিরপুর, পল্লবী আর ভাষানটেক এলাকা।
এই ফোরস্টার গ্রুপের হয়ে মাঠে কাজ করে শত শত কর্মী। এর বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন বিএনপির পদধারী নেতা কালশী মামুন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মামুনের নেটওয়ার্কের অনেকের নাম জড়িয়েছে শুরুতেই আলোচিত সানি হত্যা মামলায়। তার দুই ভাই মশিউর ও জামিল; একজন যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, অন্যজন জড়িত আবাসন প্রকল্পের চাঁদাবাজিতে।
ফোরস্টার গ্রুপের আরেক প্রভাবশালী ব্যক্তি কিলার ইব্রাহীম। তার অনুসারী জনি ভূইয়া কিবরিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার। এছাড়াও এই চক্রে সক্রিয় রয়েছে যুবরাজ, ভাগ্নে সোহেল ও সাবু।
অন্যদিকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাতের নির্দেশে এলাকায় সক্রিয় টিপু সুমন, ফিটিং শিশির, বিহারী নীলা, প্রচার সাইফুল, পিচ্চি আলামিন ও শামিম।
এছাড়া, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোক্তার হোসেনেরও রয়েছে শক্ত একটি নেটওয়ার্ক। যেখানে হাড্ডি সোহাগ, নওশাদ, শুটার জাকির, আশিকসহ আরও অনেকের নাম উঠে এসেছে।
মিরপুরের এই একটি ফোরস্টার গ্রুপই নয়, এমন আরও অন্তত ডজনখানেক চক্র রয়েছে, যাদের নিয়ন্ত্রণে পুরো ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড।
এই শহরে অন্তত দুই কোটি মানুষের বসবাস। অর্ধশত থানা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে মহানগর পুলিশ। এর বাইরে র্যাব, সিআইডি, পিবিআইসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা কাজ করলেও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কিন্তু কেন?
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মুখপাত্র এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘আইনগত যে কাঠামো আছে, অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে একটি মামলার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ। এছাড়া আরও সাক্ষ্য প্রমাণের যে বিষয়গুলো থাকে, সে সমস্ত ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। আর এই সীমাবদ্ধতা থাকার সুবাদে হয়তো, তারা দেশের বাইরে বসে, এই কাজগুলো করার চেষ্টা করে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দুই-একটা জায়গায় এমন হতে পারে, তারা হয়ত বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তার করে, এজন্য টেলিফোনে হুমকি-ধামকি দিতে পারে। অনেক সময় তাদের নাম ব্যবহার করে অনেক গ্রুপ লাইমলাইটে আসতে চায়। তাদের বিষয়ে আমাদের নজরদারি আছে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
নিয়মিত নজরদারি আর অভিযানের কথা বলা হলেও, বাস্তবে ঊর্ধ্বমুখী অপরাধের গ্রাফ।
সাম্প্রতিক একটি হত্যাকাণ্ড আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সেই পুরনো প্রশ্ন। ২৮ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে এক ব্যক্তিকে গুলি করে মোটরসাইকেল আরোহী ২ যুবক। মৃত্যু নিশ্চিত করতে, দুই দফায় তার ওপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়। মৃত ব্যক্তির পরিচয়, তিনি পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।
প্রশ্ন হলো কেন এই খুন, এর পেছনের রহস্যই বা কি? জানার চেষ্টা করি আমরা।
হত্যাকাণ্ডের দিন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম বলেছিলেন, ‘এটা আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা অবশ্যই থাকে। এ ধরনের ঘটনা এমনিতেই হয় না। প্ল্যান করে করতে হয়।’
টিটন ছিলেন মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফের ভাই টিপু হত্যা মামলার আসামি। টিটনের পরিবার বলছে, টিপু হত্যার প্রতিশোধ কিংবা পশুহাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে, তাকে খুন করা হয়েছে।
টিটনের পরিবারের সদস্যরা বলেন, ‘পিচ্চি হেলাল, কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, রনি ওরফে ভাঙাড়ি রনি, জোসেফ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকালী বাহিনী এখনও ধোঁয়াশায়, কারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত। তবে এই হত্যাকাণ্ডে যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগসূত্র রয়েছে, সেটি পরিস্কার। আন্ডারওয়ার্ল্ড এমন এক গোপন নেটওয়ার্ক যেখানে ক্ষমতা টাকা আর ভয়; এই তিনটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সমান্তরাল একটি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। এটি সংগঠিত প্রভাবশালী এক অপরাধ জগত, যা সমাজের বৈধ কাঠামোর বাইরে থেকেও নিয়ন্ত্রণ করে ভেতরের সব কিছু।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব)লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘বড় বড় সন্ত্রাসীরা সব সময়ই দেশের বাইরে থেকেই অপকর্মগুলো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংঘটিত করার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে দেশের বাইরে থেকে অপরাধে জড়ালেও যেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেজন্য আমরা কাজ করছি।’
ঢাকা শহর জুড়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্তত ডজনখানেক সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য বেরিয়ে এসেছে স্টার নিউজের অনুসন্ধানে
মোহাম্মদপুর, বছিলা, শেরেবাংলা নগরের একাংশ ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের নিয়ন্ত্রণে। এই এলাকায় সক্রিয় আছেন তোফায়েল আহম্মেদ জোসেফ, কিলার বাদল।
ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, এলিফ্যান্ট রোডসহ আশেপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের।
তেজগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, পান্থপথ ও শেরেবাংলা নগরের একাংশ সুইডেন আসলামের নিয়ন্ত্রণে।
মতিঝিল, সবুজবাগ ও কমলাপুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান।
মৌচাক, আনারকলি মার্কেট এলাকার নিয়ন্ত্রণ করেন খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু।
পোস্তগোলা এলাকার নিয়ন্ত্রণ করেন মশিউর রহমান কচি।
শাহজাহানপুর, বাড্ডা-রামপুরা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন শাহজাদা, ফ্রিডম মানিক।
গুলশান এবং বাড্ডার একাংশ মেহেদী হাসান কলিন্স ও সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে।
উত্তরা এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ ও প্রকাশ।
মিরপুর-১৪ এলাকার নিয়ন্ত্রণে আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘এই অর্গানাইজ ক্রিমিনালকে কন্ট্রোল করার জন্য যাদের আমি আমি হেল্প নেই, তারা নিজেরাই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এই যে পরোক্ষ বা প্রত্যাক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একটা অংশ, ক্রিমিনালদের একটা অংশ একটা নেকজেস তৈরি হয়। সে নেকজেসটা এখানে ভাঙতে হবে। যদি আমরা এটা ভাঙতে না পারি তাহলে আন্ডারগ্রাউন্ড থাকবে, কিলিং হবে, এলাকায় এক প্রকার ট্রাসি রাজত্ব দ্বারা কায়েম করার জন্য তারা ট্রাই করবে।’
আন্ডারওয়ার্ল্ড, এমন এক গোপন নেটওয়ার্ক যেখানে ক্ষমতা টাকা আর ভয় এই তিনটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সমান্তরাল একটি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়।
এটি সংগঠিত প্রভাবশালী এক অপরাধ জগৎ যা সমাজের বৈধ কাঠামোর বাইরে থেকেও নিয়ন্ত্রণ করে ভেতরের সবকিছু।
সৌজন্যে: স্টার নিউজ