গাজা যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে অন্তত ৫১ দেশ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:১৩ এএম
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইসিজের সামনে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ চলার সময় গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তখনও অব্যাহত ছিল, যা শুরু হয়েছিল প্রায় ১০০ দিন আগে।
বিশ্বজুড়ে বহু দেশ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিন্দা জানালেও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আহ্বান ও যুদ্ধবিরতির অনুরোধ উপেক্ষা করে অভিযান চালিয়ে যায়। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পুরো সময়জুড়ে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত ছিল। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। ইসরায়েলের কর কর্তৃপক্ষের আমদানি তথ্য, শুল্ক রেকর্ড এবং তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া যায়।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, আদালতের রায়ের পর অস্ত্র আমদানি আরও বেড়ে যায়। এর বড় অংশ ছিল গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলে মোট ২,৬০৩টি সামরিক সরঞ্জামের চালান যায়, যার মোট মূল্য প্রায় ৩.২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ৮৮৫ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ চালান এসেছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের পর।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারী দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান ও চেক প্রজাতন্ত্র। এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র মোট সরবরাহের ৪২ শতাংশের বেশি দিয়েছে, আর ভারত দিয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণহত্যার ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও কোনো দেশ অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখলে তা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সহযোগিতার দায় তৈরি করতে পারে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের দুই অধ্যাপক মনে করেন, গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু চূড়ান্ত রায়ের পর নয়, ঝুঁকি দেখা দিলেই তা শুরু হয়।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে বলে তারা মনে করে।
অন্যদিকে অনেক দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সমালোচনা বা অস্ত্র সরবরাহ স্থগিতের কথা বললেও বাস্তবে সরবরাহ অব্যাহত ছিল। যেমন চীন আইসিজের রায়কে স্বাগত জানালেও যুদ্ধ চলাকালে অস্ত্র পাঠিয়েছে। তুরস্কের পক্ষ থেকে কড়া সমালোচনা করা হলেও শুল্ক তথ্য অনুযায়ী সরবরাহ বন্ধ হয়নি। ব্রাজিলও আইসিজের রায়কে বাধ্যতামূলক বললেও কিছু সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, ইসরায়েল একা এই মাত্রার বোমাবর্ষণ চালাতে পারত না; এর জন্য বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
আল জাজিরার এই অনুসন্ধান বলছে, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বহু দেশ বাস্তবে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছে।