তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে রহস্যের জট খুলছে, খোঁজ মিলেছে মোটরসাইকেলের
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক সামরিক পাইলট ও কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। তার মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে তদন্ত চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই মধ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাহসিফের সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তার সঙ্গে সর্বশেষ সময় কাটানো বন্ধু শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন জানিয়েছে, টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার ৩০ অক্টোবর পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল জানান, যেখান থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, তার কাছাকাছি এলাকা থেকেই মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাতে শাহরিয়ার দীপ নামে স্থানীয় এক তরুণকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।
মরদেহ উদ্ধারের পর তাহসিফের সঙ্গে থাকা হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বন্ধু দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ
তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তার বন্ধু শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই। নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা তাহসিফের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন দীপ।
পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে শাহরিয়ার দীপকে পিবিআই ঢাকা মহানগর উত্তর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে ছিলেন। এ কারণে দীপের দেওয়া বক্তব্য এবং তার কাছে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো সরেজমিনে যাচাই ও বিশ্লেষণ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসার তৃতীয় তলা থেকে তাকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দীপ ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।
সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপ
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে তার বাসার নিচে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা ও হাত মেলানোর একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসে। ফুটেজটি ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার। এতে সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে ও হাত মেলাতে দেখা যায়।
তাহসিফের পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে তার বন্ধু শাহরিয়ার দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। ফুটেজ অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাদের দেখা হয়। পরে হাত মেলানোর পর তারা আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ডাকে সাড়া দিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরে দীপ জানান, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তারা একটি ওয়ার্কশপে যান। সেখানে মেরামতের কাজ শেষে রুয়াপ কমপ্লেক্সের একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খান। এরপর দীপ নিজের কাজে চলে যান এবং পরে বাসায় ফিরে আসেন বলে দাবি করেন।
তবে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া, মোটরসাইকেলটির অবস্থান এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় দীপের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ
গত ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে টঙ্গী নদীপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। পরে হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফ সাউরির বলে শনাক্ত করা হয়।
পরদিন ২৯ অক্টোবর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ছেলেকে হত্যার আশঙ্কা বাবার
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পুলিশ। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের আশঙ্কা, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।
২৯ অক্টোবর গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ২৭ অক্টোবর পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। মাকে সঙ্গে নিয়ে বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্যও কেনাকাটা করেন তিনি। সন্ধ্যার পর দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি।
তাহসিফের বাবা জানান, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে ছেলের কাছ থেকে ‘আম্মু আমি আসছি’ লেখা একটি বার্তা পেয়েছিলেন তারা। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ভোর সোয়া ৫টার দিকে পুলিশের কাছ থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা।
তার বাবা আরও দাবি করেন, তাহসিফ আগে কখনো রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যাননি।
বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্তের বিষয়ে যা জানালেন বাবা
তাহসিফের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তার বাবা জানান, শৃঙ্খলাজনিত কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়। ওই সময় আরও কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা এবং নিখোঁজ মোটরসাইকেলটির ভূমিকা সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পিবিআই।