বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মমত ইসলাম
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াত, ত্যাগ, ধৈর্য ও সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। নবুয়ত লাভের পর তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর একত্ববাদ, রিসালাত ও পরকালের বিশ্বাসের আহ্বান জানান। নানা বাধা, বিরোধিতা ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রচার অব্যাহত রাখেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মদিনায় হিজরতের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজের বিকাশে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা
৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভের পর মহানবী (সা.) আল্লাহর দ্বীন প্রচারে মনোনিবেশ করেন। প্রথমে তিনি নিজের বংশ কুরাইশদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
তৎকালীন মক্কায় বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে মানুষকে সতর্ক করার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আহ্বান জানানোর প্রচলন ছিল। সেই রীতি অনুসরণ করে একদিন মহানবী (সা.) সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কুরাইশদের সমবেত করেন।
সমবেত লোকজনের উদ্দেশে তিনি জানতে চান, পাহাড়ের অপর পাশে শত্রুসেনা অবস্থান করছে বলে জানালে তারা তার কথা বিশ্বাস করবে কি না। উপস্থিত লোকজন জানান, তারা তার কথায় বিশ্বাস করবেন, কারণ তার কাছ থেকে কখনো মিথ্যা শোনেননি।
এরপর মহানবী (সা.) তাদের আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন এবং পরকালের শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে তাদের জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষার আহ্বান জানান। নিজের নিকটাত্মীয়দেরও একই বার্তা দেন। তার এই আহ্বানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ যেন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎপথ অনুসরণ করে।
আবু লাহাবের বিরোধিতা
মহানবী (সা.)-এর এই আহ্বানে তার চাচা আবু লাহাব বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি মহানবী (সা.)-এর বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কোরআনের সুরা লাহাব অবতীর্ণ হয়।
প্রকাশ্য দাওয়াত শুরু হওয়ার পর মক্কার মুশরিকদের বিরোধিতা আরও বাড়তে থাকে। তারা মহানবী (সা.)-কে কবি, জাদুগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করে। তার প্রচারিত ধর্মকে পুরোনো কাহিনি বলেও আখ্যা দেয়।
এ ছাড়া নবুয়তের প্রমাণ দাবি করে তারা নানা প্রশ্ন ও আপত্তি উত্থাপন করত। কেউ আকাশ থেকে ফেরেশতা নামিয়ে আনার দাবি জানাত, কেউবা প্রশ্ন তুলত, তিনি সাধারণ মানুষের মতো হয়েও কীভাবে নবী হলেন। আবার কেউ কিয়ামত ও শাস্তির বিষয়ে বিদ্রূপ করত।
কুরাইশ নেতাদের একাংশের বিরোধিতার পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা ও নেতৃত্ব হারানোর আশঙ্কাও কাজ করছিল বলে ইসলামের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। মহানবী (সা.)-এর আহ্বান মেনে নিলে তাদের প্রচলিত প্রভাব ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হতে পারে, এমন আশঙ্কাও তাদের বিরোধিতাকে তীব্র করে তোলে।
নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মুখে দাওয়াত
বিরোধিতা একপর্যায়ে বিদ্রূপ ও অপপ্রচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নির্যাতনে রূপ নেয়। ইসলামের ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া, নামাজের সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এবং সেজদারত অবস্থায় তার ওপর পশুর নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ইসলামের দাওয়াত অব্যাহত রাখেন। মক্কায় প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে তিনি নতুনভাবে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তায়েফে যান। তবে সেখানেও তাকে প্রত্যাখ্যান ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়।
হিজরত ও মদিনায় ইসলামের বিকাশ
পরবর্তী সময়ে আল্লাহর নির্দেশে হিজরতের প্রস্তুতি নেওয়া হলে মহানবী (সা.) সাহাবিদের পর্যায়ক্রমে মদিনায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর তিনিও মদিনায় হিজরত করেন।
মদিনায় হিজরতের মধ্য দিয়ে ইসলামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেখানে মুসলিম সমাজের সংগঠন ও বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়। ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ ধীরে ধীরে বৃহত্তর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
ইসলামের ইতিহাসে মক্কার প্রতিকূলতা থেকে মদিনায় নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার এই যাত্রাকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম বিস্তার লাভ করে এবং বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্ম।
লেখক: ইসলামবিষয়ক গবেষক