দেশবাসীকে যুদ্ধের জন্য তৈরি থাকতে বলল চীন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
চলতি বছরের ১ অক্টোবর থেকে সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইন কার্যকর করতে যাচ্ছে চীন। নতুন এই আইনের আওতায় সামরিক প্রয়োজনে বেসামরিক মানুষ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা আরও বাড়ছে। এর ফলে আইনটি কার্যকর হওয়ার আগেই দেশজুড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিরুদ্ধে।
২০১০ সালে চীনা পার্লামেন্ট জাতীয় গণকংগ্রেসে জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইন পাস হয়। তবে এতদিন এর বাস্তব প্রয়োগ ছিল সীমিত। চলতি বছরের ২৮ আগস্ট আইনটির বড় ধরনের সংশোধনী অনুমোদন করা হয়। এরপর ১ অক্টোবর থেকে সংশোধিত আইন কার্যকরের নির্দেশ দেন শি জিনপিং।
সংশোধনের সময় আইনটির ১৪ নম্বর অধ্যায় অপরিবর্তিত রাখা হলেও ৭২ থেকে ৮২ নম্বর ধারা পর্যন্ত ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে জাতীয় প্রতিরক্ষায় বেসামরিক সম্পদ, শিল্প, প্রযুক্তি, তথ্য এবং সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে চীনা সরকারের ক্ষমতা অনেকটাই বেড়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এটিকে চীনের যুদ্ধ প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, সংশোধিত আইনের ফলে চীনের সেনা সমাবেশের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তাকে আইনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় প্রচলিত সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আর্থিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বার্থ, বিদেশে থাকা সম্পদের সুরক্ষা এবং অন্যান্য কৌশলগত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক খাতকেও সরাসরি কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাত শুরু হলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার হামলা, তথ্যযুদ্ধ এবং কৃত্রিম মেধার ব্যবহার বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই চীন আইনটি সংশোধন করেছে বলে মনে করছেন তারা।
২০২২ সাল থেকে চলা রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের দিকেও চীন গভীরভাবে নজর রেখেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আধুনিক যুদ্ধে টেলিযোগাযোগ, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সরবরাহ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা চীনকে নতুন করে প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশোধিত আইনের আওতায় ১ অক্টোবর থেকে কৃত্রিম মেধা, কৃত্রিম মেধার তথ্যকেন্দ্র, বেসামরিক ড্রোন এবং রোবটের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর চীনা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে। জাতীয় জরুরি অবস্থার মতো সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ, কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যম পরিচালনার সুযোগও তৈরি হবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, নতুন আইনের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে চীনা সরকার। জরুরি পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে বাধ্য করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম মেধা, ড্রোন, রোবট প্রযুক্তি ও উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও সরকারের হাতে থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আইন সংশোধনের মাধ্যমে সামরিক ও বেসামরিক উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান কমাতে চাইছে বেইজিং। যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহে যাতে কোনো ধরনের ঘাটতি তৈরি না হয়, সেটিও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
সংশোধিত আইনে আরও বলা হয়েছে, সামরিক অভিযান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তার জন্য ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তলব করতে পারবে সরকার।
এ ছাড়া সীমিত আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে যেকোনো বাড়ি, ভবন, যানবাহন বা সরঞ্জাম অধিগ্রহণের ক্ষমতাও পেয়েছে চীনা প্রশাসন।
চীনা সরকারের ধারণা, সংশোধিত আইন কার্যকর হলে রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে দ্রুত কাজে লাগানো সম্ভব হবে। তবে এই আইন নিয়ে এখনো শি জিনপিং প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছেন শি জিনপিং। তাদের ধারণা, সম্ভাব্য অভিযানের পরিকল্পনাও চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির শীর্ষ পর্যায়ে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তাইওয়ানকে চীন নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে। অন্যদিকে তাইওয়ানের নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ফলে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। জাপানও এতে জড়িয়ে পড়লে সংঘাত ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অন্য কোনো সংঘাতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের জন্য সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
সব মিলিয়ে সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইন কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে চীন যে সামরিক ও বেসামরিক খাতকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করতে চাইছে, তা স্পষ্ট। আর এর মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাতের জন্য বেইজিং আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।