ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম
ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে রোববার ১৮ অক্টোবর দেশটির পার্লামেন্ট তার নিয়োগ অনুমোদন দিয়েছে।
৬৮ বছর বয়সী আখলাঘির পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা। বিপক্ষে ভোট পড়েছে মাত্র ১৫টি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকে দেশটির পার্লামেন্টের অধিবেশন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
যৌথ হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন মজিদ ইবনে রেজা। নতুন নিয়োগের পর তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা
মেহরদাদ আখলাঘির বিশেষ দক্ষতা রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে। এর আগে তিনি শাহিদ বাঘেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায়ও রয়েছেন তিনি।
তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত ছিলেন আখলাঘি। সেজিল ও জুলফিকার সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আলমাস ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইয়াসিন নামের নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম বোমা তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া সেমনানের ইমাম খোমেনি মহাকাশ কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করেছেন তিনি।
সামরিক শিল্প পুনর্গঠনের দায়িত্ব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের সামরিক শিল্প পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব এখন নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাঁধে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে আখলাঘির ৪২ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার পরিকল্পনাগুলো দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্তৃপক্ষ, প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির অনুমোদন পেয়েছে।
পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আগে থেকে কারও ওপর হামলা চালাবে না। তবে কেউ ইরানে আক্রমণ করলে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই করা হবে।
চলতি মাসের শুরুতে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই নিক জানিয়েছিলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন থেকেই আখলাঘিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। তবে তেহরানের বক্তব্য, বোমা হামলার নাগালের বাইরে থাকা স্থাপনাগুলোতেও তাদের পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব সক্ষমতা আরও উন্নত করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছে ইরান।
ট্রাম্প প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি
নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রথম বক্তব্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন আখলাঘি। ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের হুমকির জবাবে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং তারা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এখন ভাবতে হবে, কীভাবে এই অঞ্চল থেকে তার বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। ইরানে বোমা হামলা চালানো হলে কতজন মার্কিন সেনাকে কফিনে করে ফিরিয়ে নিতে হবে, তা ট্রাম্প নিজেই দেখতে পাবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী সামরিক প্রয়োজন নির্ধারণে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আখলাঘি।
বৈঠকে সামরিক শিল্পের দ্রুত বিকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন, আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং সেনাসদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখা।