পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগের রেকর্ড
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
চিঠি কিংবা ছোট প্যাকেটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, আলমারি, ওয়ারড্রবসহ ভারী ও বড় আকারের পণ্যও গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। নতুন চালু হওয়া স্পিড পোস্ট সেবার মাধ্যমে গত দুই মাসে প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম।
তিনি জানান, দেশের আইনে অবৈধ নয়—এমন যেকোনো পণ্য ডাক বিভাগের গাড়িতে পরিবহন এবং পোস্টম্যানের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি মোটরসাইকেলও ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রিজ, আলমারি, ওয়ারড্রব, শিক্ষার্থীদের কাঁথা-বালিশ ও বিছানাপত্রও পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া রান্নাঘরের দা-বঁটি-ছুরি, হাঁড়ি-পাতিল, প্রেসার কুকার, ইন্ডাকশন চুলা, এলইডি টিভি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, বাইসাইকেল এমনকি কীটনাশক স্প্রে মেশিনও স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পাঠানো যাচ্ছে।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, মৌসুমি ফলসহ গত দুই মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে মোট প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে। ডাক বিভাগের ইতিহাসে এত বিপুল পরিমাণ পণ্য এভাবে পরিবহনের ঘটনা আগে ঘটেনি।
গ্রাহকদের সুবিধার জন্য অনলাইন মাশুল নির্ধারণের ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর আগেই সম্ভাব্য পরিবহন খরচ জানা যাচ্ছে। বর্তমানে রাজধানীর জিপিও, গুলশান, বনানী, মিরপুর ও উত্তরাসহ কয়েকটি সাব-পোস্ট অফিস থেকে সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পার্সেলের জন্য রয়েছে বৈদেশিক ইএমএস সেবাও।
সেবাটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য সময়সীমাও নির্ধারণ করেছে ডাক অধিদপ্তর। স্পিড পোস্টে পাঠানো পণ্য জেলা শহর থেকে ঢাকায় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা এবং প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে বিলির জন্য প্রস্তুত রাখতে সংশ্লিষ্ট পোস্ট অফিসকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে নিরাপত্তার কারণে কিছু পণ্য স্পিড পোস্টের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ, ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক রাসায়নিক, মাদকদ্রব্য, জীবন্ত প্রাণী, আগ্নেয়াস্ত্র এবং ভরা বা খালি গ্যাস সিলিন্ডার ডাকযোগে পাঠানো যাবে না।
কম মাশুলে এ সেবা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, অর্থের অঙ্কের চেয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনকেই বড় অর্জন হিসেবে দেখছে ডাক বিভাগ। জনগণকে সেবা দিতে পারার মধ্যেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির সার্থকতা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডাক বিভাগের পোস্টাল ভোট সেবার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যে আস্থা তৈরি হয়েছে, স্পিড পোস্টেও তার প্রভাব পড়েছে বলে জানান তিনি। গত সংসদ নির্বাচনে ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। ভোট দেওয়া থেকে ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রবাসীরা বার্তার মাধ্যমে তথ্য পেয়েছেন। এতে ডাক বিভাগের প্রতি তাদের আস্থা বেড়েছে।
মহাপরিচালক বলেন, নির্বাচনী অভিজ্ঞতার পর ডাক বিভাগের বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে প্রচারণা ছাড়াই মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতারা স্পিড পোস্ট থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছেন এবং নিজেরাই সেবাটির প্রচারে ভূমিকা রাখছেন।
জনপ্রিয়তা বাড়ায় ভবিষ্যতে বাসাবদলের মতো বড় পরিসরের সেবাও চালুর পরিকল্পনা করছে ডাক বিভাগ। সম্প্রতি এক গ্রাহক অন্য জেলায় বাসা পরিবর্তনের সময় পুরো বাসার আসবাবপত্র ডাকযোগে পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডাক বিভাগে এমন আন্তঃজেলা বাসাবদল সেবা চালু রয়েছে।
এ ধরনের সেবা চালুর লক্ষ্যে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পরিবহন ও সরবরাহ সক্ষমতা গড়ে তোলা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব একটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৫০টি বৈদ্যুতিক বাইক সংগ্রহ করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে চলবে।
সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ডাক বিভাগের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেইল প্রসেসিং সেন্টারের সক্ষমতা শতভাগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশ থেকে ঢাকায় আসা মেইল, ঢাকা থেকে সারা দেশে যাওয়া মেইল এবং ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ মেইল—সবকিছু একটি কেন্দ্র থেকেই প্রক্রিয়াজাত করা হবে। উদ্যোগটি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে বলে জানান মহাপরিচালক।
কমলাপুরের রেলওয়ে মেইল সার্ভিসের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরীক্ষার খাতা, গাছের চারা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য একসঙ্গে সামলানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। তাই ঢাকা জিপিও ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ করে সেখানে শুধু বিদেশে পাঠানো এবং বিদেশ থেকে আসা আমদানি-রপ্তানি পার্সেল ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তেজগাঁও ও কমলাপুরসহ মোট ৩টি হাবকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে ডাক বিভাগের মেইল ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা হবে।
কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাভের অঙ্ক ডাক বিভাগের কাছে মুখ্য নয়। সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ সেবা দিয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে একসূত্রে যুক্ত করাই স্পিড পোস্টের প্রকৃত সাফল্য।
উল্লেখ্য, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্পিড পোস্ট সেবা চালু হয়। প্রথমে মৌসুমি ফল পরিবহনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে নিত্যব্যবহার্য বড় ও ভারী পণ্যসামগ্রী পরিবহনেও সম্প্রসারিত হয়েছে এ সেবা।