বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ৬২ লাখ প্রবীণ, বাড়ানোর উদ্যোগ ভাতার পরিমাণ
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ৬২ লাখ নারী ও পুরুষকে বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে সরকার। চলতি বছর উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ।
তবে বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য অনেক প্রবীণ এখনো এ কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছেন। ভবিষ্যতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হলে যোগ্য সব প্রবীণকে পর্যায়ক্রমে ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সচিব।
বুধবার ৭ অক্টোবর নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির আওতা প্রতি বছর ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। একসময় ৬০ লাখ প্রবীণকে এ সুবিধা দেওয়া হলেও পরে উপকারভোগীর সংখ্যা ৬১ লাখে উন্নীত করা হয়। চলতি বছর আরও ১ লাখ প্রবীণকে কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ায় বর্তমানে মোট ৬২ লাখ মানুষ এ সুবিধা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এখনো দেশের সব প্রবীণকে কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী নারীদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়স হলে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি হয়। তবে নির্ধারিত বয়সসীমা পূরণ করলেই সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ সুবিধা পান না। আবেদনকারীদের নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই বাছাই করে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
সচিব বলেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক আবেদন তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ভবিষ্যতে বাজেট সক্ষমতা বাড়লে পর্যায়ক্রমে সব যোগ্য ব্যক্তিকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠী দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান। কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার অর্থ সমাজে একজন মানুষের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়স্ক ভাতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে এ ভাতা সহায়তা করছে। পাশাপাশি পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রবীণদের আত্মমর্যাদা ধরে রাখতেও এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ভূমিকা রাখছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সমাজকল্যাণ সচিব বলেন, মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তাই প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ চলাচল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রবীণদের চলাচলের সুবিধার জন্য রেল ও মেট্রোরেলসহ কিছু গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশেষ সুবিধা রয়েছে বলেও জানান ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ। তিনি বলেন, গণপরিবহনে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ ভাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রেল ও মেট্রোরেলসহ গণপরিবহনে প্রবীণদের ২৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রবীণদের জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, নিরাপদ আবাসন, বিনোদন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে তারা পরিবার ও সমাজে আরও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
প্রবীণদের কল্যাণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে প্রবীণদের সম্মান করা এবং তাদের দেখাশোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই মূল্যবোধ ধরে রাখার পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবীণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
সমাজকল্যাণ সচিব বলেন, অনেক প্রবীণ এখনো শারীরিকভাবে সক্ষম এবং বিভিন্নভাবে সমাজে অবদান রাখতে পারেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে প্রবীণদের সক্রিয় জীবন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নবীন প্রজন্মও তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে।
বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও লক্ষ্যভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, বয়স্ক ভাতার আওতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উপকারভোগীদের ভাতার পরিমাণও পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আগের তুলনায় বেশি আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন।
ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক ভাতার আওতাও আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাজেট বৃদ্ধি পেলে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য সব ব্যক্তিকে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
সমাজকল্যাণ সচিব আরও বলেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে শুধু ভাতা প্রদান নয়, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহনে বিশেষ সুবিধা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগসহ সমন্বিত প্রবীণবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।