শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া কি জায়েজ, ইসলামের বিধান কী
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৬ পিএম
শিশুদের আদর করা, বুকে জড়িয়ে ধরা এবং কপালে চুমু দেওয়া স্নেহ ও ভালোবাসা প্রকাশের স্বাভাবিক মাধ্যম। ইসলামেও শিশুদের প্রতি দয়া, মমতা ও ভালোবাসা প্রদর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও শিশুদের আদর করতেন এবং চুমু দিতেন। তবে শিশুদের আদর করার ক্ষেত্রে শালীনতা, ব্যক্তিগত সীমারেখা ও নিরাপত্তা রক্ষা করাও জরুরি। প্রশ্ন হলো, শিশুদের চুমু দেওয়া সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
শিশুদের চুমু দেওয়া সম্পর্কে হাদিসে যা বলা হয়েছে
শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রকাশের বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু দেন। এ সময় আকরা ইবনে হাবিস নামের এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু তিনি কখনো তাদের কাউকে চুমু দেননি।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।’
হাদিসটি সহিহ বুখারিতে ৫৯৯৭ নম্বর হাদিস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশ ইসলামে প্রশংসনীয়। সন্তানকে আদর করা, বুকে জড়িয়ে ধরা এবং চুমু দেওয়া মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহসম্মত আচরণের অন্তর্ভুক্ত।
শিশুদের চুমু না দেওয়ার বিষয়ে নবীজির বক্তব্য
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার কয়েকজন বেদুইন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জানতে চান, তিনি শিশুদের চুমু দেন কি না। তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ।
তখন তারা জানান, তারা নিজেদের শিশুদের চুমু দেন না। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে দয়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি কী করতে পারি?’
হাদিসটি সহিহ মুসলিমের ২৩১৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদিসে শিশুদের প্রতি স্নেহ ও মমতা প্রকাশের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সন্তানকে আদর করা কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, বরং শিশুর সঙ্গে ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি মাধ্যম।
শিশুদের প্রতি মমতা সম্পর্কে কোরআনের শিক্ষা
পবিত্র কোরআনে শিশুদের চুমু দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। তবে মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, দয়া ও কোমলতা প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ সুরা আল বাকারা, আয়াত ৮৩।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মুমিনদের প্রতি তোমার বাহু অবনত করো।’ সুরা আল হিজর, আয়াত ৮৮।
আয়াতগুলোতে উত্তম আচরণ ও কোমলতার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। শিশুদের চুমু দেওয়া ও তাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশের বিষয়ে হাদিসে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়।
অন্যের শিশুকে চুমু দেওয়া কি জায়েজ
নিজের সন্তান, নাতি নাতনি কিংবা আপনজনদের শিশুকে আদর করে মাথায় বা কপালে চুমু দেওয়া সাধারণভাবে জায়েজ। অন্যের শিশুকে স্নেহ করাও নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ নয়। তবে এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি।
প্রথমত, শিশুর অভিভাবকের অনুমতি ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশু নিজে অস্বস্তি বোধ করলে তাকে জোর করে চুমু দেওয়া বা কোলে নেওয়া উচিত নয়। তৃতীয়ত, শিশুর বয়স, সম্পর্ক, পরিবেশ এবং ইসলামের শালীনতার বিধান বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিশেষ করে বালেগ হওয়ার কাছাকাছি বয়সের শিশু-কিশোর এবং বালেগদের ক্ষেত্রে মাহরাম ও গায়রে মাহরামের বিধান, পর্দা এবং শারীরিক স্পর্শের সীমারেখা মেনে চলা প্রয়োজন। গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে কামনাসংশ্লিষ্ট বা যৌন প্রকৃতির স্পর্শকে সাধারণ স্নেহের অজুহাতে বৈধ বলা যায় না।
আদরের নামে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কি জায়েজ
শিশুকে চুমু দেওয়া জায়েজ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, যেকোনো ব্যক্তি যেকোনোভাবে শিশুকে স্পর্শ করতে পারবেন। স্নেহ প্রকাশ এবং যৌন নিপীড়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
শিশুর সংবেদনশীল অঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ করা, যৌন উদ্দেশ্যে কাছে টানা, অস্বস্তিকরভাবে জড়িয়ে ধরা কিংবা শিশুর আপত্তি উপেক্ষা করে শারীরিক সংস্পর্শ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিশু ছোট হলেও তার অনুভূতি, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।
আবার কোনো শিশুকে চুমু দেওয়ার ঘটনা দেখেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন নিপীড়নের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। একইভাবে, শিশুর কোনো অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়া অনুচিত। অভিযোগ উঠলে শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে রেখে, ভয় দেখানো বা প্রভাবিত না করে, প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সহায়তায় বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি
শিশুদের আদর করার সময় অভিভাবক, শিক্ষক ও অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্ব হলো তাদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি সম্মান দেখানো। শিশুদের বোঝাতে হবে, তাদের শরীরের ব্যক্তিগত সীমারেখা রয়েছে এবং কোনো স্পর্শে অস্বস্তি হলে তারা আপত্তি জানাতে পারে।
শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কোনো অভিযোগ জানালে তাকে দোষারোপ না করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া ইসলামে জায়েজ এবং মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। তবে এই বৈধতা স্নেহ, মমতা ও শালীনতার সীমার মধ্যে। শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য, অভিভাবকের দায়িত্ব, বয়সোপযোগী সীমারেখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ইসলামের শিক্ষা হলো, শিশুদের ভালোবাসতে হবে, তাদের প্রতি দয়া দেখাতে হবে এবং সব ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।