ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের ৭ নেতার মামলার রায় আজ
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১০ পিএম
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের গণআন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ মঙ্গলবার।
সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এটি হতে যাচ্ছে ট্রাইব্যুনালের সপ্তম রায়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন। কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেও তারা ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, আসামিদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল ২। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
গত ২ আগস্ট এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
১২ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষকে হত্যা ও আহত করার জন্য আসামিরা দায়ী বলেও দাবি করেন তিনি।
শুনানিতে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামিম দাবি করেন, জুলাইয়ের আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অডিও ও ভিডিওতে এসবের প্রমাণ রয়েছে বলেও তারা আদালতকে জানান।
প্রসিকিউশনের দাবি, ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পর ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
যৌথ অপরাধের ব্যাখ্যা তুলে ধরে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, আন্দোলন দমনের সময় একজন নিহত হলেও আসামিরা সমানভাবে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্কে তাদের মক্কেলদের নির্দোষ দাবি করে খালাসের আবেদন করেন।
ওবায়দুল কাদের, নাছিম ও আরাফাতের পক্ষে আইনজীবী এম হাসান ইমাম দাবি করেন, জনগণের জানমাল রক্ষার জন্যই গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, তার মক্কেলরা কোনো কমান্ডিং অবস্থানে ছিলেন না। কমান্ডের দায়ের ক্ষেত্রে তিনি শুধু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন। তার দাবি, সব ধরনের নির্দেশই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এসেছে। তবে তাকে এই মামলায় আসামি করা হয়নি।
আইনজীবী আরও দাবি করেন, ২৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জন ছিলেন ভুক্তভোগীদের স্বজন। তাদের কেউই ওবায়দুল কাদের, নাছিম ও আরাফাতকে জড়িয়ে কোনো সাক্ষ্য দেননি।
অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতা শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও ওয়ালি আসিফ ইনানের পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার মক্কেলদের নাম আসেনি। বরং তারা অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আইনজীবীর দাবি, শুধু রাজনীতি করার কারণে আন্দোলন ঘিরে তারা কিছু বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রসিকিউশনের কোনো ভিডিওতে তাদের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
এ ছাড়া নারীদের আহত হওয়ার অভিযোগ করা হলেও কোনো নারী সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা হয়নি বলে জানান আসামিপক্ষের এই আইনজীবী।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছিল। ওই সময়ে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কোনো সুযোগ ছিল না।
গত ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল ২।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়।
ইতোমধ্যে দুটি ট্রাইব্যুনাল জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় দিয়েছেন। এসব রায়ে মোট ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ১১ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে বন্দী রয়েছেন।