ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে পা হারায় রায়হান, ছড়ায় ভিন্ন অভিযোগ
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার সাতগড় গ্রামের শিশু মো. রায়হানের একটি পা ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর একটি চক্র কেটে দিয়েছে, সম্প্রতি এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশের অনুসন্ধানে এ অভিযোগের সঙ্গে ঘটনার বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। মূলত ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে অস্ত্রোপচার করে রায়হানের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে থাকার সময় আল আমিন নামে এক যুবকের সঙ্গে লাভের অংশের বিনিময়ে পানি বিক্রি করত রায়হান। পাশাপাশি সে ভিক্ষাবৃত্তিও করত। চলতি বছরের ১১ জুন ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোসল করে কমলাপুরে ফেরার পথে ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয় সে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার পর পুলিশ রায়হানকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ জুলাই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তার একটি পা কেটে ফেলা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও রাখা হয়েছিল। পরে মাথায় আঘাতের চিকিৎসার জন্য তাকে জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ও নিউরোসার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
ঢাকা রেলওয়ে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অস্ত্রোপচারের পর রায়হানকে প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। এ সময় তার পরিচর্যার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে একজন আয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আরেছা নামের ওই নারী প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে থেকে রায়হানের দেখাশোনা করেন।
পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর রায়হান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের জরিনা নামের এক নারীর কাছে আশ্রয় নেয়। স্টেশনে জরিনাকে সবাই ‘মালির মা’ নামে চিনতেন। সেখানে থাকার পাশাপাশি রায়হান ভিক্ষাবৃত্তি করত।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে রায়হান জানায় তার মা মারা গেছেন এবং সে বাড়িতে ফিরতে চায়। পরে তার বন্ধু জাকির তাকে যাত্রাবাড়ীতে নিয়ে যায় এবং একটি বাসে তুলে দেয়।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, রায়হানকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল রিয়াজুল করিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ ছাড়া রেলওয়ে স্টেশনের মিনা নামের এক নারীও শিশুটির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এরপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মিনাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করছেন বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, বিষয়টি দুঃখজনক।
এদিকে ট্রেন দুর্ঘটনায় রায়হান আহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে হাসপাতালের মেঝেতে বসে রায়হানকে বলতে শোনা যায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সে আহত হয়েছে। একই সময়ে সে জানায়, তার মা বাবা নেই। ভিডিওতে তার মাথা ও পেটে আঘাতের চিহ্নও দেখা যায়।
রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দীনের ছেলে। ১২ বছর বয়সী রায়হান একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত। প্রায় সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতি এলাকার একটি মাহফিলে স্থানীয় বাসিন্দারা রায়হানকে দেখতে পান। পরে তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হলে শিশুটির বাবা সেখানে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন। রায়হানের বাবা পেশায় দিনমজুর। তার মায়ের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়েছে এবং বর্তমানে মা ও বাবা আলাদা সংসারে বসবাস করছেন। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে রায়হান তার সৎমায়ের সঙ্গে থাকত।
পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করার সময় রায়হানের ডান পা ছিল না। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের চিহ্ন দেখা যায়। এরপরই ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর একটি চক্র তার পা কেটে দিয়েছে বলে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রায়হান ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কথা বলতে রাজি হননি। তারা বর্তমানে হাসপাতালে রয়েছেন বলেও জানা গেছে।