ছোট্ট তুবার ভালোবাসায় বদলে গেলো খুঁটিতে বাঁধা সেই বাবার ভাগ্য
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
চুরির অভিযোগে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অভুক্ত বাবার মুখে নিজের হাতে রুটি তুলে দিয়েছিল ছোট্ট তুবা। এক কাপ চা আর রুটি নিয়ে বাবার পাশে দাঁড়ানো শিশুটির সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরপরই বদলে যেতে শুরু করে অনিক সিকদার ও তার পরিবারের জীবন।
বরিশালের উজিরপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় অনিক সিকদার আর কোনো অন্যায় করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা। পাশাপাশি তুবার পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উই আর বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও অনিককে একটি ভ্যান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একসময় স্বচ্ছল পরিবার ছিল অনিকদের। তবে বাবার অসুস্থতার পর পরিবারের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায় সঞ্চয় ও সম্পদ। এরপর অভাবের সঙ্গে যুক্ত হয় নানা সংকট।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, অনিক নেশায় জড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় একটি মাদকচক্র তার দুর্বলতার সুযোগ নেয়। এর মধ্যেই শুক্রবার রাতে উজিরপুরের বামরাইল বাজারে চুরির চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে স্থানীয়রা তাকে আটক করে বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন।
বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখে সেখানে ছুটে যায় তার ছোট্ট মেয়ে তুবা। অভুক্ত বাবার জন্য এক কাপ চা ও রুটি নিয়ে আসে সে। এরপর নিজের ছোট্ট হাতে রুটি টুকরো করে বাবার মুখে তুলে দেয়। বাবার অপরাধ বা নির্দোষতার বিচার করার বয়স হয়নি তার। সে শুধু বুঝেছিল, তার বাবা ক্ষুধার্ত এবং একা।
অনিকের স্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে অভাবের কারণে তাদের সংসারে নানা সমস্যা চলছিল। তুবা তার বাবাকে খুব ভালোবাসে। সেদিন বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে সে পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এবং নিজের হাতে তাকে খাবার খাওয়ায়।
তুবার বাবার মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। পরে রোববার অনিকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, তুবার পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে অনিক যাতে কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারেন, সে জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা বলেন, তুবার ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে। অনিককেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে অনিকের কর্মসংস্থানের জন্য এগিয়ে এসেছে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উই আর বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাকে একটি ভ্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অনিক আয় করে পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উই আর বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পুলিশ সদস্য এসএম আকবর বলেন, অনিকের প্রয়োজনের সময়ে যতটুকু সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রয়োজন, সংগঠনের পক্ষ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী তা অব্যাহত রাখা হবে।
অনিক সিকদার বলেন, তার কোনো ভুল হয়ে থাকলে তিনি আর অন্যায় করবেন না। কাজ করে পরিবারকে ভালোভাবে চালাতে চান তিনি। মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সবার সহযোগিতা চান।