শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে অন্য স্কুলে পদায়ন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলায় পঞ্চম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠা শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে শাস্তির আওতায় না এনে বারবার বদলি করার অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তাকে চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৬ সালের শুরুতে সাজাই নতুন গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক কুপ্রস্তাব ও যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে শিক্ষক মামুনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
অভিযোগের পর বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ বজলুর রহমান বিষয়টি নিয়ে বিচারের উদ্যোগ নেন। পরদিন সকাল ১০টায় বিদ্যালয় মাঠে সালিশি বৈঠকের আয়োজন করা হলেও নির্ধারিত সময়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মামুন সেখানে উপস্থিত হননি। পরে তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক ভিডিও বার্তা ও লিখিত অঙ্গীকারে সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ বজলুর রহমান বলেন, সঠিক সময়ে অভিযুক্ত মামুনকে হাজির করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে এলাকাবাসীর সঙ্গে একমত হয়ে তিনি ওই শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এর আগে সাজাইয়ের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২০ সালে যোগদান করেন মামুন। পরে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তাকে সাজাই নতুন গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। সেখানেই তার বিরুদ্ধে শিশু শিক্ষার্থীকে হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের পরও ওই শিক্ষককে শাস্তির আওতায় না এনে চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদায়ন করায় অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ সন্তানদের ওই বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টি তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও সেখানে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে তার মেয়েও ওই বিদ্যালয়ে পড়ছে। কিন্তু এমন একজন শিক্ষকের পদায়নের কারণে তিনি মেয়েকে আর ওই বিদ্যালয়ে পড়াবেন না বলে জানান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত এম জি আরিফ উদ্দীনের কাছে জানতে চাওয়া হলে, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন ওই শিক্ষককে শাস্তি না দিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। জবাবে তিনি বলেন, বিএনপির আহ্বায়ক শিক্ষা কমিটির একজন সদস্য। কমিটির বৈঠকের দিন তিনি শিক্ষক মামুনের বিষয়ে সুপারিশ করেন। পরে ওই সুপারিশ ও শিক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি বদলির আদেশ জারি করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোখলেছুর রহমান বলেন, শিক্ষক মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এরই মধ্যে আপস মীমাংসা হয়েছে। তার দাবি, এর আগে মামুনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বদলি করা হয়নি। অভিযোগের কারণে তাকে সাময়িকভাবে অন্যত্র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর তাকে নতুন কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত কমিটির সভার মাধ্যমে নিয়ম মেনেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা কমিটির আরেক সদস্য ও উপজেলা জামায়াতের আমির আবুল বাশার মো. আব্দুল লতিফের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অভিযুক্ত শিক্ষককে বিদ্যালয়ে পদায়নের বিষয়ে চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা আক্তার বলেন, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের যোগদানের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিভাবক তার কাছে সরাসরি অভিযোগ করেননি। এ বিষয়ে কারও অভিযোগ থাকলে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারেন বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু শিক্ষার্থীকে হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত না করে তাকে অন্য বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। তারা দ্রুত ওই পদায়নের আদেশ বাতিল করে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।