৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৩ পিএম
চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য দিতে হাজির না হওয়ায় বিপাকে পড়েছে পুলিশ প্রশাসন। দিনের পর দিন আদালতের সমন উপেক্ষা করায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কর্মরত ও দেশের বিভিন্ন ইউনিটে বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এমনকি অনেকের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। এতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা পুরোনো মামলাগুলোর বিচারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ইউনিটগুলোকে একের পর এক জরুরি চিঠি পাঠাতে হচ্ছে। কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্য রয়েছেন এই তালিকায়। তাদের কেউ চট্টগ্রামে কর্মরত, আবার কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও এসবির মতো বিশেষায়িত ইউনিটেও কর্মরত রয়েছেন অনেকে।
গত ৩ অক্টোবরের একটি দাপ্তরিক চিঠি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এসব চিঠিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত দিনে সকাল ৯টায় আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বিরুদ্ধে এর আগে একাধিকবার সমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সর্বশেষ জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তারপরও তারা আদালতে হাজির হননি। তাদের অনুপস্থিতিকে মামলা নিষ্পত্তির প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে আদালত। নির্ধারিত দিনে সাক্ষীদের হাজির করতে ব্যর্থ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানানো হয়েছে।
পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নির্ধারিত পুলিশ সদস্যদের অধিকাংশই একসময় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো হয়েছে পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানায়।
এসব মামলা চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত এবং শিশু আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
২০২২ সালের হত্যা মামলাও আটকে আছে
শুধু সাধারণ মামলাই নয়, গুরুতর অপরাধের মামলার বিচারকাজও পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত একটি হত্যা মামলায় পুলিশ কমিশনারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়, ২০২২ সালে দায়ের করা ওই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বাদীসহ অন্যান্য সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে একাধিকবার সমন পাঠানো হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলাটির বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আগামী ১৮ নভেম্বর সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কমিশনার, সিএমপির কাছে আদেশের অনুলিপি পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীদের হাজির করতে ব্যর্থ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১(২) ধারা অনুযায়ী মামলার কোনো বিরূপ ফলের দায় পুলিশ কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বদলির কারণে থেমে যাচ্ছে সাক্ষ্যগ্রহণ
আদালতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা পরবর্তী সময়ে অন্য জেলা বা ইউনিটে বদলি হওয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আদালত থেকে পাঠানো সমন অনেক সময় পুরোনো কর্মস্থলে পৌঁছায়। এরপর তা রিজার্ভ অফিস, সিএমপি দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট ঘুরে নতুন কর্মস্থলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
কখনো নির্ধারিত সময়ে সমন সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর কাছে পৌঁছায় না। আবার সমন হাতে পেলেও আদালতে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে নির্ধারিত দিনে আদালতে হাজির হতে পারছেন না অনেক পুলিশ সদস্য।
আদালতের কয়েকজন বেঞ্চ সহকারী জানান, পুলিশ সাক্ষীদের বিরুদ্ধে সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা মূলত তাদের হাজিরা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার অংশ। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য আদালতে হাজির হলে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাওয়া হয়। তবে সাক্ষীদের অনুপস্থিতিতে পুরোনো মামলাগুলোর বিচারকাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
নোয়াখালীতেও ১২১ পুলিশ সাক্ষীকে হাজিরের নির্দেশ
চট্টগ্রামের পাশাপাশি নোয়াখালীতেও পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। নোয়াখালীর পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে জেলার বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে পাঠানো এক চিঠিতে ১২১ জন পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত থাকার পরও কিছু পুলিশ সদস্য আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না। এতে বিচারপ্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হচ্ছে। নির্ধারিত দিনে অনুপস্থিত থাকা এবং যথাযথভাবে সাক্ষ্য না দেওয়া পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো পুলিশ সদস্য সাক্ষ্য দিতে অনুপস্থিত থাকলে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে বিষয়টি জানাতে এবং অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিবেদন প্রতি মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশনাও রয়েছে।
আগেও শত শত পুলিশ সদস্যকে হাজিরার তাগিদ
সিএমপি সূত্র জানায়, পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে এর আগেও একাধিকবার দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি পাঠানো একটি চিঠিতে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন মামলায় সাক্ষ্য দিতে ৩৩ জন পুলিশ সদস্যকে আদালতে হাজির হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তাদের কেউ সিএমপির বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায়, আবার কেউ ঢাকা মহানগর পুলিশসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত ছিলেন।
এর আগে গত বছরের ১৯ নভেম্বরও একই ধরনের চিঠি পাঠানো হয়েছিল। গত কয়েক মাসে অন্তত ১০টি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে তিন শতাধিক পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএমপি সূত্র।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরাও তালিকায়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত পুলিশ সাক্ষীদের একটি অংশ ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তকমা এবং পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে তাদের অনেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বদলি হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যেও কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসছেন না। আবার কেউ কেউ মবের ভয়ে আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
এদিকে তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বদলি, সমন পৌঁছানোর জটিলতা এবং আদালতে হাজিরার প্রশাসনিক সমস্যায় আটকে যাচ্ছে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ।
চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে বলেন, সমন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়া, পুলিশ সদস্যের অবসর গ্রহণ কিংবা অন্যান্য কারণে সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হতে পারেন না। এতে মামলার জট বাড়তে থাকে।
তিনি আরও বলেন, একবার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন শুনানি চালিয়ে যাওয়ার নিয়ম রয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকার আইন সংশোধন ও নতুন আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সমন কার্যকরের পাশাপাশি তাদের যাতায়াত খরচ ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি ওই ধরনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়, বরং সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাগিদ। অনেক পুলিশ সদস্য দূরে বদলি হওয়া, অসুস্থতা, সমন যথাসময়ে না পাওয়া কিংবা সমন পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ার কারণে আদালতে আসতে পারেন না। আবার কোনো কোনো সাক্ষী মারা গেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, পুলিশের সাক্ষীরা আদালতে হাজির না হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর সমস্যা। একজন সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে বিচারপ্রার্থী ও রাষ্ট্র উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, বদলি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে তা সমাধান করে সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আদালতের নির্দেশ ও পরোয়ানার পরও সাক্ষীরা হাজির না হলে এর দায় নির্ধারণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে শুধু নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না, সাক্ষ্যগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াও কার্যকর করতে হবে।