রংপুরে একই পরিবারের চার খুন, একাধিক আলামতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর ডিএনএর মিল
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২ এএম
রংপুর মহানগরীর মাছুয়া পাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা কামড় দেওয়া খেজুর, শসা, সিগারেট ও খেজুরের বিচির নমুনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর অপরাধ তদন্ত বিভাগের পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৩৫টি আলামত সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ছিল সিগারেটের অংশ, খেজুর, শসা, ফল কাটার চাকু, মাদক সেবনের সরঞ্জাম এবং বেসিনের দাগ। এসব আলামতের একটি অংশ ঢাকায় অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
পরে গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নমুনা সংগ্রহের জন্য সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সে সময় তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হবে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পরও সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ কিছু সময় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে অবস্থান করেছিল। এ সময় তারা গোসল করে এবং বাড়ির ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খায়। পরে বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনাস্থলে পাওয়া কামড় দেওয়া শসা, খেজুর ও খেজুরের বিচি শুরু থেকেই তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। পাশাপাশি সিগারেটের অংশসহ অন্যান্য জৈব ও বস্তুগত নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এসব আলামতে দুই আসামির ডিএনএর মিল পাওয়ায় তদন্তে নতুন তথ্য যুক্ত হয়েছে।
এ মামলায় গ্রেপ্তারের পর মুগ্ধ দাস, ২৩, ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পরে এসব বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন তদন্তকারীরা।
তদন্তের শুরুতে পুলিশ জানিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের অবস্থান এবং সেখানে মাদক সেবন নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। চারজনকে হত্যার পর বাড়িতে অবস্থান, বিভিন্ন কক্ষ তছনছ এবং স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলোও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, একাধিক আলামতে ডিএনএর মিল মামলার বৈজ্ঞানিক তদন্তকে আরও জোরালো করতে পারে। বিশেষ করে ঘটনাস্থলে পাওয়া খাদ্যদ্রব্য ও ধূমপানের আলামতে দুই আসামির ডিএনএর উপস্থিতি হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে শুধু ডিএনএর মিলকেই অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। আদালতে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি জবানবন্দি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, অন্যান্য আলামত, লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের তথ্য এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর মহানগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়া পাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুই দিন যোগাযোগ না হওয়া এবং বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার পর স্বজনেরা বিষয়টি জানতে পারেন। পরে পুলিশ গিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের তদন্তে চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার তথ্য উঠে আসে। পরে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পর থেকেই ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।