তাজমীনকে ধর্ষণ ও হত্যার পর মসজিদের পুকুরে গোসল করে সুমন
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৭ পিএম
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমীনকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর ঘটনাস্থলে অটোরিকশা ফেলে কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে অভিযুক্ত সুমন মিয়া। পরে অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদে গিয়ে তাজমীনের আইফোন একটি জঙ্গলে লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায় সে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরে এসব জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া।
পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর লালমাই উপজেলার জগতপুর চরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের পর জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নিহত তাজমীন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার গ্রামের বাড়ি যশোরে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। চালক সুমন প্রথমে ৫০০ টাকা ভাড়া চাইলে পরে ৩০০ টাকায় যাওয়ার চুক্তি হয়। পথে একটি দোকান থেকে ১০০ টাকা দিয়ে চালকের জন্য রুটি ও কলা কিনে আনে তাজমীন।
পুলিশ জানায়, বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সুমন নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে অটোরিকশাটি ঘুরিয়ে চাঁদপুর সড়কের দিকে নিয়ে যায়। পরে বিজরা বাজার হয়ে নির্জন এলাকায় পৌঁছে অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয় সে। জায়গাটি চিনতে না পেরে তাজমীন প্রশ্ন করলে সুমন জানায়, এটি রেসকোর্স এলাকা নয়। বিপদের আশঙ্কা করে অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে কিশোরীটি।
এ সময় তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করলে তাজমীন চিৎকার শুরু করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানিয়েছে, সে গামছা দিয়ে তাজমীনের গলা পেঁচিয়ে ধরে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাজমীন দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ধর্ষণ করে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে সে। পরে ধানক্ষেতে নিয়ে মাথায় পা দিয়ে চেপে ধরে তাজমীনের মৃত্যু নিশ্চিত করে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে সুমন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেয় সুমন। এরপর ঘটনাস্থলে অটোরিকশা রেখে কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে সে। পরে অন্য একটি ভাড়ায়চালিত অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে পুকুরপাড়ের একটি জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রাখে। সেখান থেকে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, সুমনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদের ওই জঙ্গল থেকে তাজমীনের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার ভ্যানিটি ব্যাগ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে এবং অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, ঘটনার রাতে ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন তার বাবার সঙ্গে নিজের সরাসরি অবস্থানের তথ্য শেয়ার করেছিল। তবে তার বাবা তাৎক্ষণিকভাবে সেটি দেখতে পাননি। ভোরের দিকে অবস্থানের তথ্য দেখে তিনি ওই এলাকায় মেয়েকে খুঁজতে যান।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের একটি নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজও পুলিশের হাতে এসেছে। ওই ফুটেজে তাজমীনকে অটোরিকশায় শান্তভাবে বসে থাকতে দেখা যায়। অটোরিকশায় অন্য কেউ ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত চালক সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, তাজমীন গত ৪ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ ছিল। তবে তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগ করা হয়নি। নিখোঁজ থাকার ওই চার দিন তাজমীন কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল কিংবা কেউ তাকে প্ররোচিত করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, সুমন এ বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিলেও ধর্ষণের অভিযোগ চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া আইফোনটি তাজমীনকে তার পরিবার কিনে দিয়েছিল কি না, তা তার বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।