নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৮ পিএম
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আদালতটির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের খবর ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক বিরোধ আরও বাড়িয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার মূল ভিত্তির ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছে আইসিসি। একই সঙ্গে আদালতটির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
এক বিবৃতিতে আইসিসি জানায়, আদালত একা টিকে থাকতে পারে না। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই রাষ্ট্রগুলোর ওপরও, যারা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার বিষয় নয়, বরং আইনের শাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়।
যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আইসিসি। তবে দীর্ঘদিন ধরেই আদালতটির বিরোধিতা করে আসছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর আগে আদালতটির কৌঁসুলি ও বিচারকদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এবারের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। কারণ, আইসিসিকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানও সম্ভাব্য শাস্তির মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে আইসিসি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে পরিচিত রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করলেও পরে তা অনুসমর্থন করেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে কোনো মার্কিন নাগরিকের বিচার করার অনুমতি দেবেন না।
তিনি আরও জানান, এ কারণেই আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আদালতটির সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করা, এর সম্পদ ও অর্থপ্রাপ্তির পথ বন্ধ করা এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করাই এ পদক্ষেপের লক্ষ্য।
নিষেধাজ্ঞায় ছয় মাসের ছাড়
মার্কিন অর্থ বিভাগ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের ছাড়ের সময়সীমা রেখেছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ছাড়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ফলে টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন এবং কিছু আর্থিক লেনদেন চালু রাখা সম্ভব হবে।
মার্কো রুবিও বলেন, নিষেধাজ্ঞাগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে আইসিসি ও এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়গুলো সমাধানের সুযোগ পায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞার শর্ত পরিবর্তন করা হতে পারে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের কারণে আইসিসির বিরোধিতা করে আসছে ওয়াশিংটন। তবে আফগানিস্তানসংক্রান্ত তদন্তকে বর্তমানে কম অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে আদালতটি।
আইসিসির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামিম খান রয়টার্সকে বলেন, এ নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দুর্বল করা। তবে এসব পদক্ষেপের মধ্যেও আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন, ছয় মাসের সময়সীমা আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আইসিসি যাতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য জোটটির হাতে প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে, আইসিসিকে সুরক্ষা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা প্রতিরোধী আইন কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আইসিসি বিশ্বনেতা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ ৭০ জনেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ তালিকায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাশাপাশি হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও রয়েছেন।
এ ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির এবং লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। কেনিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো এবং দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অবশ্য পরে প্রত্যাহার করা হয়।