পৃথিবীতে আছড়ে পড়ছে নাসার মহাকাশ টেলিস্কোপ, বাংলাদেশের পাশেই ‘বিপদে’ যেসব এলাকা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৫ পিএম
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দেড় টন ওজনের একটি মহাকাশ টেলিস্কোপ। ধারণা করা হচ্ছে, এর বেশির ভাগ অংশ বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তবে কিছু অংশ পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়তে পারে। সম্ভাব্য পতন এলাকার মধ্যে রয়েছে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি অঞ্চল। ফলে বাংলাদেশের আশপাশের এলাকাগুলোও সম্ভাব্য ঝুঁকির বলয়ের মধ্যে রয়েছে।
নাসার এই মহাকাশ টেলিস্কোপের নাম ‘নিল গেহরেলস সুইফট অবজারভেটরি’। প্রায় ২২ বছর আগে, ২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর এটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। শুরুতে এর নাম ছিল সুইফট গামা রে বার্স্ট এক্সপ্লোরার। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ভোর ৩টা ৩০ মিনিটে, অর্থাৎ ভারতীয় সময় দুপুর ২টার দিকে টেলিস্কোপটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে। তবে এ সময়ের সঙ্গে প্রায় ১১ ঘণ্টার ব্যবধান থাকতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় যন্ত্রটির অধিকাংশ অংশ পুড়ে যাবে। তবে কয়েকটি অংশ অক্ষত অবস্থায় ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
নাসার মিশনের প্রধান বিজ্ঞানী ব্র্যাড সেনকো জানিয়েছেন, টেলিস্কোপটির সম্ভাব্য পতন এলাকার মধ্যে রয়েছে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ।
নাসার হিসাব অনুযায়ী, টেলিস্কোপটির বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সম্ভাব্য অঞ্চল দক্ষিণ অক্ষাংশের ২০ দশমিক ৬ ডিগ্রি থেকে উত্তর অক্ষাংশের ২০ দশমিক ৬ ডিগ্রির মধ্যে বিস্তৃত। পৃথিবীর মানচিত্রে এই অঞ্চলটি মাঝামাঝি অংশজুড়ে একটি বলয় তৈরি করেছে।
ভারতের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য এই বলয়ের মধ্যে পশ্চিম উপকূলের দামান থেকে পূর্ব উপকূলের ওডিশার কটক পর্যন্ত একটি কাল্পনিক রেখার দক্ষিণের অঞ্চলগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে মুম্বাই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের মতো শহর রয়েছে। অন্যদিকে দিল্লি, কলকাতা এবং উত্তর ভারতের বড় একটি অংশ সম্ভাব্য অঞ্চলটির বাইরে রয়েছে।
তবে সম্ভাব্য অক্ষাংশের বলয়ের মধ্যে কোনো শহর থাকলেই সেখানে টেলিস্কোপটির ধ্বংসাবশেষ পড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় টেলিস্কোপটি পৃথিবীর ঠিক কোন অবস্থানে থাকবে, তার ওপর প্রকৃত পতনস্থল নির্ভর করবে।
এদিকে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে যাওয়া মহাকাশবস্তু পর্যবেক্ষণের জন্য ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। শ্রীহরিকোটায় অবস্থিত ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার মাল্টি অবজেক্ট ট্র্যাকিং রাডার রকেটের ধ্বংসাবশেষ ও কৃত্রিম উপগ্রহসহ বিভিন্ন মহাকাশবস্তুকে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগেই শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে।
তবে নাসার এই মহাকাশ টেলিস্কোপটি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা পর্যবেক্ষণ করছে কি না, সে বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। কয়েকজন বিশেষজ্ঞের ধারণা, টেলিস্কোপটির ধ্বংসাবশেষ শেষ পর্যন্ত কোনো মহাসাগরে গিয়ে পড়তে পারে।
জ্যোতির্পদার্থবিদ এবং ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক অধ্যাপক জোনাথন ম্যাকডাওয়েল সংবাদমাধ্যম গিজমোডোকে জানিয়েছেন, সম্ভাব্য পতন এলাকার একটি বড় অংশই মহাসাগর। তার ধারণা, টেলিস্কোপটির মোট দেড় হাজার কেজি ওজনের মধ্যে ১০০ কেজি উপাদানও যদি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর অক্ষত থাকে, তবে সেটি হবে বিস্ময়কর।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ ব্র্যাড টাকার বলেন, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ অঞ্চল মহাসাগর এবং ৩০ শতাংশ স্থলভাগ। সে হিসাবে কোনো মহাকাশবস্তুর পৃথিবীতে পতনের ক্ষেত্রে স্থলভাগে পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমন ১০টি ঘটনার মধ্যে প্রায় তিনবার কোনো বস্তু মহাসাগরের পরিবর্তে স্থলভাগে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলিস্কোপটির কোনো অংশ পৃথিবীতে পড়লেও অবকাঠামোর ক্ষতি কিংবা মানুষের আহত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত কম।
টেলিস্কোপটিকে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে নাসার নেওয়া প্রচেষ্টা সফল হয়নি। শুরুতে এর মিশনের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র দুই বছর। তবে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে এটি মহাকাশে কার্যক্রম চালিয়েছে।
দীর্ঘ ২২ বছরের যাত্রায় টেলিস্কোপটি দুই হাজারের বেশি গামা রশ্মির বিস্ফোরণ এবং এক হাজার ৪০০টি সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করেছে। দীর্ঘদিনের মহাকাশ অভিযান শেষে এবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এই বৈজ্ঞানিক যন্ত্র।
সূত্র: এনডিটিভি