সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম
সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্বচ্ছ ও নীতিনির্ভর পদোন্নতি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
রোববার (২৬ জুলাই) ঢাকা সেনানিবাসে সেনাসদর দপ্তরে আয়োজিত ‘সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে কাজ করলে বাহিনীতে পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। একজন সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা এবং দক্ষতার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিত্বও বিবেচনায় রাখা উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সামুদ্রিক ও সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় হুমকি, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যযুদ্ধ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তাসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুযায়ী একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সরকারপ্রধান বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি শুধু সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি এবং সহনশীলতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাবনার আলোকে এমন একটি আধুনিক জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
তারেক রহমান বলেন, যুদ্ধের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। এখন নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা। তাই ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার সক্ষমতা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের দক্ষতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে।
তিনি জানান, সরকারের প্রতিরক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংখ্যার পরিবর্তে সক্ষমতা, প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং একক বাহিনীর পরিবর্তে যৌথ সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং গণতান্ত্রিক সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে যোগ্য কর্মকর্তাদের বাছাই করে পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করা হলে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদার নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্যান্টনমেন্ট তার জীবনের আবেগঘন একটি অংশ। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় সেনা পরিবেশে কাটানোর কারণে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি স্বাধীনতার ঘোষক ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং তার নেতৃত্বে স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা, সীমান্ত উন্নয়ন, মাইন অপসারণ এবং সন্ত্রাস দমনে সেনাবাহিনীর অবদানের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে শাহাদাতবরণকারী সেনাসদস্যদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান এবং মালিতে দায়িত্ব পালনকারী সেনাসদস্যদের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। এছাড়া দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয় শান্তিরক্ষীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি, আইনশৃ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা, অবাধ নির্বাচন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম এবং জাতীয় বিভিন্ন সংকটে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সেনাবাহিনীও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিল। বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাহিনীকে নিজেদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও সততার মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
শারীরিক সক্ষমতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত মার্কিন জেনারেল এইচ নরম্যান সোয়ার্জকফের একটি উক্তি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শান্তিকালে যত বেশি ঘাম ঝরবে, যুদ্ধক্ষেত্রে তত কম রক্ত ঝরবে। তাই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।
শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদের মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, সক্ষমতা ও গৌরবের ধারাবাহিকতা আরও সুদৃঢ় করবেন। পাশাপাশি তিনি সরকারের মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’-এর কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।