রুহুল-সোহেলের পর দীর্ঘ তিন দশক ধরে ছাত্রদলের কমিটিতে নাম ওঠেনি উত্তরবঙ্গের
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। দুপুরের তীব্র রোদ পেছনে ফেলে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক নির্ভীক যুবক। দুই হাত দু’পাশে প্রসারিত করে, বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন পুলিশের তপ্ত বন্দুকের নলের সামনে। তার সেই বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক মুহূর্ত কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। তিনি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, বীর শহীদ আবু সাঈদ।
আবু সাঈদের সেই মহান আত্মত্যাগ উত্তরবঙ্গের ছাত্ররাজনীতিতে এক নতুন স্ফুলিঙ্গের জন্ম দিয়েছে। উত্তরবঙ্গের মাটি যে বীরের মাটি, রক্ত দিয়ে তিনি আবারও তা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু রাজপথের এই বীরত্বের সমান্তরালে আরেকটি লড়াই চলছিল রাজধানী ঢাকায়, যেখানে উত্তরবঙ্গের আরেক সন্তান বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতি। তিনি শামীম আক্তার শুভ- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার এক অকুতোভয় তরুণ।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা শামীম আক্তার শুভর রাজনৈতিক পথচলা মোটেই মসৃণ ছিল না। বিগত স্বৈরাচারী শাসনের আমলে উত্তরবঙ্গের ছাত্ররাজনীতি যখন তীব্র অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার, ঠিক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথে ছাত্রদলকে সংগঠিত রাখতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন শুভ।
আবু সাঈদের জন্মভূমিতে যখন স্বৈরাচারের বুলেটের আঘাতে লাশ পড়ছিল, ঠিক তখন ঢাকার রাজপথে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতাকে এক সুতোয় গাঁথছিলেন রৌমারীর এই অদম্য সন্তান। রাজনৈতিক প্রতি হিংসার শিকার হয়ে একাধিকবার তাকে পুলিশি নির্যাতন, হামলা ও মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে রৌমারীর মুক্তাঞ্চলের বীরত্বগাথা রক্ত যার ধমনীতে, তাকে দমানো সম্ভব হয়নি। হামলা-মামলা কিংবা রক্তচক্ষু-কোনো কিছুই থামাতে পারেনি শুভর অগ্রযাত্রা।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় ৩৫ বছর আগে রুহুল কবির রিজভী ও হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের পর উত্তরবঙ্গ থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের শীর্ষ নেতৃত্বে আর কেউ উঠে আসতে পারেননি। সাড়ে তিন দশকের এই দীর্ঘ অবহেলা ও নেতৃত্বহীনতা উত্তরবঙ্গের লাখো কর্মীর মনে তৈরি করেছে গভীর ক্ষোভ ও ক্ষত। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন- "আমরা ত্যাগে প্রথম, কিন্তু মূল্যায়নে সবার শেষে।"
তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং আবু সাঈদের রক্তের পর প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করেছে। উত্তরবঙ্গের অবহেলিত ও বঞ্চিত ছাত্ররাজনীতির অধিকার ফিরিয়ে দিতে এখন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে শামীম আক্তার শুভর নাম। ঢাবি ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব সামলানো শুভ এখন কেবল রৌমারী বা কুড়িগ্রামের নন, বরং পুরো উত্তরবঙ্গের ছাত্ররাজনীতির এক ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে আবু সাঈদের বীরত্ব যেমন স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত করেছিল, ঠিক তেমনি ঢাকার রাজপথে শামীম আক্তার শুভর মতো ত্যাগী নেতাদের অব্যাহত লড়াই সেই আন্দোলনকে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।
উত্তরবঙ্গের তৃণমূল ছাত্রনেতাদের মতে, "আবু সাঈদের উত্তরবঙ্গ আর অবহেলার পাত্র নয়। সীমান্ত জনপদের সন্তান শামীম আক্তার শুভ যেভাবে বছরের পর বছর জেল-জুলুম ও হামলা-মামলা সহ্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাতে এবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার মূল্যায়ন সময়ের দাবি। ৩৫ বছরের নেতৃত্বের খরা কাটানোর যোগ্য উত্তরসূরি তিনিই।"
শহীদ আবু সাঈদের রক্তস্নাত উত্তরবঙ্গের ছাত্রদল এখন আর পেছনে ফিরে তাকাতে চায় না। সীমান্তঘেঁষা জনপদ থেকে উঠে আসা শুভ যদি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের হাল ধরেন, তবে তা হবে সাঈদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উত্তরবঙ্গের বঞ্চিত রাজপথের প্রতি এক যোগ্য সম্মান।