সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো নির্বাচন নেই: জামায়াত আমির
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
সংবিধান মেনে চললে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বিএনপির প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেছেন, নির্ধারিত ওই দিনে নির্বাচন না হলে বিএনপি সরকার গঠন করল কীভাবে এবং জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে গেল কীভাবে? তার দাবি, দেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ বর্তমান সংবিধানের কাঠামো। এই সংবিধান শুধু ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়নি, বরং ফ্যাসিবাদকে দীর্ঘস্থায়ী করার ব্যবস্থাও তৈরি করেছিল। তাই প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি এখন সংবিধানের কথা বলছে কেন, সেই প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, অতীতে সংবিধান মেনেই দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সভা, সমাবেশ ও মিছিল করতে হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়নি। জামায়াতে ইসলামী কিংবা বিএনপি কেউই তখন কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কার্যকর পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কারাগারে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা কারাগারে ছিলেন। একই কারাগারে থাকার সময় তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতো। তখন কেউ কেউ মনে করতেন, ২০৪১ সালের আগে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হবে না। তবে তিনি বলেছিলেন, এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না। শেখ হাসিনার উত্তরসূরিরাও একই রাজনৈতিক ধারা বহন করতে পারেন বলে তিনি তখন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এলেও পরিস্থিতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক রাজনৈতিক নেতা অতীতের ঘটনাগুলো ভুলে গেছেন বলেও অভিযোগ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, অতীতে সভা, সমাবেশ ও মিছিল করতে গিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে মাত্র দুটি সভা করার সুযোগ পেয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অনুমতি না পেলেও তারা সভা করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, যেসব বিষয়ে পরিবর্তন প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছে। আবার যেসব বিষয়ে ভিন্নমত দেওয়া হয়নি, সেগুলোও এখন এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার প্রশ্ন, জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজন করা হয়েছিল কেন? তার মতে, এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছিল। অতীতে সংসদে বসেই জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, তাদের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল কিংবা ১১ দলীয় জোটের স্বার্থে নয়, বরং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তাদের প্রতিটি দাবি জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দুর্নীতির পরিবর্তন চান। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার এবং কার্যকর পরিবর্তনই তাদের প্রত্যাশা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশ নেন। সাত মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনার পর অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অঙ্গীকার ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর অংশীজনেরা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রথমে স্বাক্ষর না করলেও পরে সনদে স্বাক্ষর করে। তার মতে, জুলাই জাতীয় সনদ শুধু একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
একই দিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, তারা একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনের পক্ষে ছিলেন না। তাদের দাবি ছিল, আগে গণভোট এবং পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে দুটি ভোট হলে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়গুলো গুলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্য হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, গণভোটের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছিল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই দাবি মেনে নেয়। পরে বিএনপি এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও অন্তত একবার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। জামায়াতও একই অবস্থানে ছিল। তবে বিএনপি বাস্তবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ছিল না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, দেশে ও বিদেশে দলটির পক্ষ থেকে কর্মী সমর্থকদের ‘না’ ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের মধ্য দিয়ে জনগণ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট করেছেন বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তবে দেশে এখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং বৈষম্য বাড়ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তাদের অন্যতম দাবি ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে তারা যে প্রত্যাশা তুলে ধরেছিলেন, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করা জরুরি। এখন সংবিধান সংশোধনের কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা এবং যেসব জায়গায় ভিন্নমত রয়েছে, সেসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের মতামত উপেক্ষা করার পর বিরোধী দলকেও কি জনগণের সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করতে বলা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। জামায়াতে ইসলামী তা মেনে নেবে না জানিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অটল থাকার কথা বলেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনের আইনি দিক তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, অতীতেও একাধিকবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে কিংবা বাতিল হয়েছে। তাই শুধু আরেকটি সংশোধনী এনে সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে কার্যকর ও টেকসই সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নিজেদের আন্দোলন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ভালোবাসা তাদের সঙ্গে রয়েছে। তারা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছেন এবং এ লড়াইয়ে জনগণের বিজয় হবে বলে তিনি আশাবাদী। এই বিজয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা পরিবারের হবে না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন ও দ্রব্যমূল্যের চাপের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা বলেছেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, নিজের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার খাওয়ার স্বাধীনতা তার রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ যেন অন্তত দুবেলা স্বস্তিতে খাবার খেতে পারেন এবং শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সাধারণ মানুষের শান্তি কেড়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আসন্ন লংমার্চ প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে শুরু হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে লংমার্চ শেষ হবে। এ কর্মসূচি ঘিরে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র না করার আহ্বান জানান তিনি। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে লংমার্চের কাফেলা চট্টগ্রামে পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। সেদিন পথে বাধা এলেও তারা কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনড় ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছেছিলেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, তারা ন্যায় ও জনগণের অধিকারের পক্ষে রয়েছেন বলে বিশ্বাস করেন। আল্লাহর সাহায্যে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। কোনো বাধা কিংবা ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করবেন না উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।