জনগণ আমাদের ভোট দিলেও তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে: জামায়াত আমির
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণ তাদের ভোট দিলেও তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভোট দেওয়ার পরও তা রক্ষা করতে না পারার বিষয়ে জনগণ প্রশ্ন তুললে নিজেদের দুর্বলতার কথা স্বীকার করতে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য আল্লাহর জান্নাত অর্জন করা। যারা দিন আনে দিন খায়, আল্লাহর পথে তাদের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ৭০ শতাংশ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, যাদের বড় একটি অংশ দিন আনে দিন খায়।
সংগঠনের দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অতীতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সংগঠন পরিচালনায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। বর্তমান সময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার পাশাপাশি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। জান্নাত অর্জনের লক্ষ্যে নিজেদের জীবন গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে আলোচনা করতে গিয়ে শফিকুর রহমান মৃত্যু, পরকালীন জীবন এবং মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জ্ঞান ও সম্পদের দিক থেকে নিজের চেয়ে দুর্বল মানুষের কথা বিবেচনা করতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে এবং তার সাহায্য কামনা করতে হবে।
নবী ইবরাহিম ও নবী ইসমাইলের ওপর আল্লাহর পরীক্ষা এবং তাদের ত্যাগের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মহান আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি মুহূর্তে তার সাহায্য কামনা করতে হবে। একটি সার্থক জীবন গড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার তাওফিক কামনা করেন তিনি।
ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের সাংগঠনিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, একসময় দুই মহানগরীর সাংগঠনিক অবস্থাই দুর্বল ছিল। নেতা কর্মীদের ত্যাগ, কোরবানি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ তাদের ভোট দিলেও তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভোট দেওয়ার পরও তা রক্ষা করতে না পারার অভিযোগ তুলে জনগণ প্রশ্ন করলে নিজেদের দুর্বলতার কথা স্বীকার করতে হয়।
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, যাদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের বড় নিয়ামত রয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে। কোনো চোরকে আর ছাড় দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তারা থামবেন না, থামার সুযোগও নেই। আসন্ন সিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়ে দিনরাত কাজ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার এগোতে পারলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দেশ পরিচালনার বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, এই দেশের জনগণই ঠিক করবে কারা দেশ পরিচালনা করবে। সমাজ পরিবর্তনের জন্য আর বসে থেকে তামাশা দেখা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংগতভাবেই প্রতিবাদ করা হবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, এই দেশ কোরআনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ যেন তার রহমত দিয়ে সবাইকে আবৃত রাখেন এবং সহযোগিতা করেন। আসন্ন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার জন্য রুকনদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে ঢাকা মহানগরী উত্তরের উদ্যোগে তৈরি ‘নাগরিক সেবা’ নামের একটি অ্যাপ উদ্বোধন করেন শফিকুর রহমান। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপটিতে নাগরিকদের জন্য ৫০টিরও বেশি সেবামূলক সুবিধা পাওয়া যাবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকনিয়াত কোনো পদ বা পদবি নয়, বরং এটি একটি মান। একে ক্ষমতা মনে করা ভুল হবে।
তিনি আরও বলেন, রুকনিয়াত হলো জীবনের নীতি নৈতিকতার মান বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রুকনদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাদের মান ও আধ্যাত্মিক শক্তি যত বাড়বে, সংগঠনও তত শক্তিশালী হবে। আগামী মেয়র নির্বাচনে ত্যাগ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। এর মাধ্যমে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে সফলতা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, রুকনের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সদস্যদের মান, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক দক্ষতাও বাড়াতে হবে। আস্থাভাজন নেতৃত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্মেলনটি দুটি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে নির্বাচনী অধিবেশন। এ সময় ২০২৭ ও ২০২৮ সেশনের জন্য ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির নির্বাচনে ভোট দেন রুকনরা। নির্বাচনে ১৩ হাজারের বেশি সদস্য অংশ নেন।
নির্বাচন পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন। তাকে সহযোগিতা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য আব্দুস সবুর ফকির।
সকাল ১১টা থেকে শুরু হয় সাংগঠনিক অধিবেশন। ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং মহানগরীর সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন ও নুরুল ইসলাম বুলবুল।