সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল শুরু, প্রথম দিন গেলেন ৮৩৬ পর্যটক

সারাদেশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৪ এএম

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনুমোদন জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রথম দিনেই ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে দ্বীপটির উদ্দেশে যাত্রা করেছে একটি জাহাজ। এর মধ্য দিয়ে পর্যটন মৌসুম শুরুর চার দিন পর সচল হলো সেন্টমার্টিনের নৌপথ।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে এমভি বারো আউলিয়া জাহাজটি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রশাসনিক অনুমোদন, নৌযান চলাচলের ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি।

পরে নৌপরিবহন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার অনুমোদন এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মতি পাওয়ার পর জাহাজ চলাচলের পথ সুগম হয়।

সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বুধবার জানান, পর্যটকের সংখ্যা বিবেচনায় না নিয়ে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জাহাজ চলাচল শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম দিন এমভি বারো আউলিয়া যাত্রা করলেও পর্যায়ক্রমে বাকি দুটি জাহাজও চলাচল শুরু করবে।

তিন জাহাজে যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮

প্রথম দিন একটি জাহাজে ৮৩৬ জন পর্যটক যাত্রা করলেও অনুমোদন পাওয়া তিনটি জাহাজের সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বারো আউলিয়ায় ৮৫০ জন, এমভি কর্ণফুলীতে ৭৩২ জন এবং এমভি টেকনাফে ৭১৬ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।

নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বারো আউলিয়া সকাল ৭টায় কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করবে এবং দ্বীপ থেকে ফিরবে বেলা আড়াইটায়। এমভি কর্ণফুলী সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে ফিরবে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। অন্যদিকে এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে গিয়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় দ্বীপ থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেবে।

সবগুলো জাহাজই কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়া ঘাট ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন করবে।

প্রথম দিন সপরিবারে সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন ঢাকার পর্যটক রবিউল হোসেন। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিন তার খুবই প্রিয় জায়গা। পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। প্রথম দিনেই দ্বীপে যেতে পেরে ভালো লাগছে। তবে জাহাজ ছাড়তে কিছুটা দেরি হয়েছে।

ময়মনসিংহ থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তরিকুল আহমেদ বলেন, তিন দিনের জন্য পাঁচ বন্ধু মিলে সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন তারা। সমুদ্রপথের যাত্রা বেশ রোমাঞ্চকর। আশা করছেন, নিরাপদে দ্বীপে পৌঁছাতে পারবেন।

প্রতিদিন যেতে পারবেন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক

সরকারের সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতের সুযোগ থাকবে। এ সময় পর্যটকেরা দ্বীপ ভ্রমণের পাশাপাশি রাত্রিযাপনও করতে পারবেন। তবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটককে দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।

পর্যটকদের জন্য এবার কয়েকটি শর্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোডযুক্ত টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।

এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকদের পরিচয় ও যাতায়াতের তথ্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পর্যটনে অনুমতি, পরিবেশ রক্ষায় কঠোর বিধিনিষেধ

পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও সেন্টমার্টিনের ভঙ্গুর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একাধিক বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় পর্যটকদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। এ ছাড়া কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি বাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টমার্টিনের মতো ছোট ও সংবেদনশীল দ্বীপে পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির ব্যবহার, জ্বালানি, শব্দদূষণ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ম বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।

পর্যটন ঘিরে বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য, আশায় ব্যবসায়ীরা

দীর্ঘদিন পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায় নতুন করে গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পর্যটক পরিবহনের পাশাপাশি দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন ও অন্যান্য সেবামূলক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তারা।

বিশেষ করে দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত। পর্যটকদের আগমন শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রুবেল বলেন, প্রতিবছর তারা এই সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। পর্যটন মৌসুম সেন্টমার্টিনের মানুষের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। পর্যটকদের ভ্রমণ আনন্দদায়ক করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেন্টমার্টিনকে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় পর্যটনের বাণিজ্যিক প্রসার একসময় দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

প্রকাশক: মাহমুদুল হাসান

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সুজন মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক: শরিফুল ইসলাম

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: ২/এ, কালাচাঁদপুর মেইন রোড, ঢাকা- ১২১২

ইমেইল: monojogprokashnews@gmail.com

মোবাইল: 09658369970