হত্যার দাবি করল ভারত, গণমাধ্যমের সামনে তাকেই হাজির করল পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম
কাশ্মীরের পেহেলগাম হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসাকে চিহ্নিত করে তাকে হত্যার দাবি করেছিল ভারত। তবে সেই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে হাশিম মূসাকে সংবাদ সম্মেলনে হাজির করেছে পাকিস্তান। দেশটির সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ভারতীয় গণমাধ্যমে যাকে নিহত বলে প্রচার করা হয়েছে, তিনি জীবিত ও সুস্থ আছেন।
বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে ভারতের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেন। এ সময় তিনি মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসাকে সবার সামনে হাজির করেন এবং ভারতীয় বাহিনীর অভিযানে তার নিহত হওয়ার দাবিকে উপহাস করেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে অভিযানের সময় হাশিম মূসাকে নিষ্ক্রিয় বা হত্যা করার দাবি করেছিল। তবে আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমে যাকে নিহত হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, সেই ব্যক্তি জীবিত এবং সম্পূর্ণ সুস্থ।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত বছরের ২২ এপ্রিল পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরের কোরাগ এলাকায় অভিযানে নিহত হয়েছেন। পরে তার পরিচয় মোহাম্মদ আসিফ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি করে ভারত। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, আসিফ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আহমেদ শরীফ চৌধুরী ভারতীয় দাবিকে তথাকথিত সন্ত্রাসী ঘটনা উল্লেখ করে এটিকে ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর সাজানো অভিযান বলে মন্তব্য করেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে পুরো ঘটনার পাঁচ দফা সময়রেখাও তুলে ধরেন।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিন্নার কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, যৌথ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী কোরাগ ও ইউসমার্গের আশপাশে অভিযান শুরু করেছে।
পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে চিন্নার কোরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযানে লস্কর ই তৈয়বার এক সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই দাবি করে, নিহত ব্যক্তির পরিচয় মোহাম্মদ আসিফ হিসেবে নিশ্চিত হয়েছে। ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোও একই ধরনের দাবি করে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও দাবি করেছিল, মূসা ওরফে আসিফ ফৌজিকে নিষ্ক্রিয় করা মে মাস থেকে চলমান দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের অংশ। এ বিষয়ে আহমেদ শরীফ চৌধুরী ব্যঙ্গ করে বলেন, ছয় মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর মূসা ওরফে আসিফ ফৌজিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তাই এ জন্য অভিনন্দন ও করতালি দেওয়া উচিত।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম আসিফকে কাশ্মীরে একাধিক হামলার সঙ্গে যুক্ত বলেও দাবি করেছিল। এসব হামলার মধ্যে ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট হালান, একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর ডিকেজি, ২০২৩ সালের মে মাসে কান্ডি, ২০২৪ সালের মে মাসে শাহ সিতার, একই বছরের জুনে শিব খোরি, অক্টোবরে গানগানগীর ও বুটা পাহাড়ি এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাসিরা এলাকার হামলার কথা উল্লেখ করা হয়।
ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছিল, আসিফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একই গোষ্ঠীর আরও তিন সদস্যকে অভিযানে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, এসব প্রচারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিজেদের প্রচারের বিষয়ে লজ্জা পাওয়া উচিত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো মুছে ফেলা উচিত। তিনি ভারতীয় প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর একটি বিবৃতিও পড়ে শোনান। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, অভিযানে লস্কর ই তৈয়বার চারজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
পরে তিনি বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও স্ক্রিনশট সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন। এর মধ্যে নিউজ ১৮, দ্য স্টেটসম্যান, ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস, এবিপি লাইভ ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন ছিল।
এরপর আহমেদ শরীফ চৌধুরী মোহাম্মদ আসিফকে মঞ্চে আসতে বলেন। তিনি জানান, আসিফ পাকিস্তানের আটক জেলার বাসিন্দা। এ সময় তিনি ব্যঙ্গ করে আসিফকে সুপারম্যান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তার কথিত কৃতিত্ব সম্পর্কে জানতে চান।
আসিফ বলেন, আগের দিন তার বন্ধুরা ফোন করে জানিয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে যে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করেছে এবং তিনি শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তিনি জানান, তিনি জীবিত ও সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
আসিফের দাবি, ভারতীয় নম্বর থেকে তার কাছে একাধিক ফোন এসেছিল। ফোনকারীরা তার ব্যক্তিগত তথ্য, পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। পরে এএনআইয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে তিনি জানতে পারেন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাকে কাশ্মীরের একটি অভিযানে নিহত হিসেবে প্রচার করেছে।
তিনি বলেন, ওই সময় তিনি নিজের বাড়িতেই ছিলেন। বিষয়টি তিনি তার ইউনিটকে জানান। পরে ইউনিট থেকে তাকে ভারতীয় নম্বর থেকে আসা সব ফোন ব্লক করতে বলা হয় এবং জানানো হয়, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
আসিফ আরও জানান, তিনি ২০০০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ২০০৫ সালে স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপে যোগ দিয়ে সেখানে ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। এরপর তিন বছর একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গত তিন থেকে চার মাস ধরে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও কর্তৃপক্ষের অভিযোগকে মিথ্যা, লজ্জাজনক ও অসম্মানজনক বলে অভিহিত করেন আসিফ। তিনি এসব দাবির নিন্দা জানিয়ে বলেন, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় তিনি জীবিত এবং সবার সামনে উপস্থিত আছেন।
তিনি আরও বলেন, নিজের দায়িত্ব তিনি সাহসের সঙ্গে পালন করেছেন এবং পাকিস্তান সামনাসামনি জবাব দেয়, আড়াল থেকে নয়।